Saturday, March 13, 2010

ফাস্টার, হায়ার, স্ট্রঙ্গার
কাহিনির শুরু বলিউড থেকে।
চাক দে ইন্ডিয়া। এক বিতর্কিত হকি ব্যক্তিত্বের নিজের সঙ্গে লড়াই করার পাশাপাশি ভারতীয় মহিলা হকি দলকে নিয়ে স্বপ্নের মিনারে চেপে বসার গরমাগরম, সুপারহিট ছবি। কতোটা তারমধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে বাস্তবতার ছোঁয়া অথবা সেলুলয়েডের অতি সহজ-সরল সমাধানের সূত্র ধরে নিজের জীবনকে মেলাতে গিয়ে কোথায়, কী সুবিধার মুখ দেখা গেছে তা নিয়ে তর্কটা এখন থাক। মূল বিষয়টা অন্য জায়গায়। রাজ্যসভায় ঐতিহাসিক মহিলা সংরক্ষণ বিল পাস হয়ে যাওয়ার পরেও প্রশ্ন থাকছেই। মহিলাদের যথাযথ অবস্থান ঠিক এখনও কোন পর্বে রয়েছে?
কবীর খান থেকে শুরু করে বিদ্যা শর্মা, বলবীর কাউর অথবা কোমল চৌতালা বা সোইমুই কেরকেটা। নামগুলো এখনও ভুলে গিয়েও ভোলা যাচ্ছে না। ভোলা সম্ভবও হয় না। জনপ্রিয় ছবিতে ভেসে ওঠা সেই খানিকটা নিজেরই অপূর্ণ, অবদমিত ভাবনাগুলো যখন এমনই কিছু নামের মধ্যে ফুটে ওঠে, মাথার ভেতরটা কেমন যেন ঝনঝন করে। হরেক ব্যস্ততার ফাঁকেও নামগুলো রয়েই যায় অতি সঙ্গোপনে। কিন্তু তারপর!
তাহলে দেখা যাক অন্য মেরুতে দাঁড়িয়ে। অঞ্জুম চোপড়া, দোলা ব্যানার্জি, ঝুলন গোস্বামী, মৌমা দাশ, মেরি কোম, নেহা আগরওয়াল অথবা গীতু আন্না। বাজি রেখে বলে ফেলা যায় প্রথম তিন-চারটে নাম অতি পরিচিত হওয়ার পরেই কেমন যেন পরীক্ষার হলে বসে আনসিন কোয়েশ্চেনদেখার মতো দুর্বোধ্য। হয়তো আন্দাজ করাই যায় কিছু একটা বিশেষ ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে এইসব নামের সঙ্গে, তবে তো ফের প্রশ্ন জাগে প্রতিদিনের আলোচনায় সেই নামগুলো কেন মুখ্য বিবেচ্যে পরিণত হতে পারে না। পুরোদস্তুর নিরপেক্ষতা নিয়েই এটুকু তো বলাই যায়, ভারতীয় খেলাধুলার জগতে যতোরকম হুলুস্থুল কাণ্ডকারখানা ঘটে চলে অহরহ এবং তা নিয়ে আম পাবলিকেরও রয়েছে বিবিধ অভিমত সেক্ষেত্রে সাম্য ব্যাপার তো থাকবেই। কিন্তু আছে কি?
খোলাবাজারি অর্থনীতির রমরমা এবং তার প্রকোপে বাকি সবকিছুকেই খুল্লমখুল্লা করে ফেলার তীব্র ইঁদুর দৌড়ই ঘুম থেকে খবরের কাগজে চোখ রেখে সেরা আইটেমে পরিণত হয়েছে। তাহলে এই মেয়েগুলোর খামতি কোথায় যে ছোট্ট একটা জায়গাও বানিয়ে ফেলতে পারে না! তাদের নিয়ে নেই কোন প্রচার, নেই বিজ্ঞাপনদাতাদের হুড়োহুড়ি, নেই বাজারী রেষারেষি।এও আবার একটা কথা হলো নাকি!
কথা যেমনই হোক, বাস্তবে চোখ রাখলে অতি বড় সমালোচকও স্বীকার করতে বাধ্য, গত এক দশকে ভারতীয় খেলাধুলার জগতে মহিলাদের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এগিয়ে আসার প্রয়াস জারি রয়েছে। বলা যেতে পারে সেখানে বাহুল্য নেই, নেই ক্যামেরার লেন্সের সতর্ক দৃষ্টি। তাহলেও গতি রয়েছে। এইমুহূর্তে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল আই সি সি র‌্যাঙ্কিংয়ের তিন নম্বরে। বাস্কেটবলে গীতু আন্নাকে নিয়ে খোদ মার্কিন মুলুকের উওমেন বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন পর্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। সেই তুলনায় ২০০২ কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয়ের পর থেকে এযাবৎ ভারতীয় মহিলা হকি দল নতুনভাবে দাগ কাটতে পারেনি কিন্তু লড়াই রয়েছে জারি। তাই বলে দোলা ব্যানার্জি বা মেরি কোমের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা হচ্ছে না খাটো।মজার ব্যাপার, এতোসমস্ত উদাহরণ খাড়া করেও মূল জায়গায় পৌঁছেই গুলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। এদের জন্য কেউ নেই। নেই সহায়তার ভাবনা। কেন?
এইমুহূর্তে যে সমস্ত বহুজাতিক সংস্থার বদান্যতায় এগিয়ে চলেছেন সফল পুরুষ ক্রীড়াবিদরা,সেই বিপুল বিনিয়োগ থমকে দাঁড়াচ্ছে মহিলাদের আঙিনায় পা রেখেই। শুনতে হয়তো খারাপই লাগে কিন্তু টেনিস বাদ দিয়ে সানিয়া মীর্জার আনুষঙ্গিক ভাবভঙ্গী বিজ্ঞাপনদাতাদের বাজার ধরার কাজ ঠিক যতোখানি সহজ করে দেয়, বাকিদের ক্ষেত্রে তা কিছুতেই মেলার নয়। ফলে একশো শতাংশ স্পোর্টস রোল মডেলহয়েও দোলা অথবা ঝুলনরা কিছুতেই মন ভেজাতে পারছেন না বিজ্ঞাপন জগতের কর্তাব্যক্তিদের। বেঙ্গালুরুর নামজাদা সংস্থা গো স্পোর্টসসংস্থার আধিকারিক নন্দন কামাথ যাকে ব্যাখ্যা করছেন,‘হিরো ওয়ারশিপ বলে যে কথাটা খুব প্রচলিত এই বিজ্ঞাপনী মহলে সেখানে সানিয়াকে ছেড়ে দ্বিতীয় কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বা পাওয়া গেলেও ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করার ইচ্ছা নেই কারোর।ওখানে আরো কিছু ফ্যাক্টর দরকার’!
২০০৮ বেজিং ওলিম্পিকে ভারতের একমাত্র বাইচ প্রতিনিধি হিসাবে হাজির ছিলেন নেহা আগরওয়াল।নেহা যেমন কিছু করে দেখাতে পারেননি, তেমনই তাঁকে নিয়ে ফেডারেশনেরও ছিলো না কোনরকম পরিকল্পনা যাকে সম্বল করে পরবর্তীতে কিছু করার সুযোগ থাকে। বাণিজ্যিক দুনিয়াতে কলকে পেতে হলে আরো অনেককিছুর সঙ্গে ভালোমতো ইংরাজি বলাও যে খুব দরকারী তা নিয়ে কারোরই মাথা ব্যথা ছিলো না, নেইও। অন্তত নেহা নিজেই তা অনুভব করেছেন,‘প্রথমত দৃষ্টিভঙ্গিই একমুখী, তারপরেও যে সুযোগ ছিলো সেই আমাদের মতো প্রতিনিধিদের এগিয়ে যাওয়ার পথে যেরকম পেশাদারিত্বের শিক্ষার প্রয়োজন ছিলো তা পূরণ হয়নি, কেউ তা নিয়ে ভাবতেও চাননি। ফলে সাফল্য থাকলেও তার কোন মূল্য থাকে না প্রচারের দুনিয়াতে।
কমবেশি একই অভিজ্ঞতা গীতু আন্নার। মাত্র ২৪ বছর বয়সেই গীতু প্রথম ভারতীয় হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার ক্লাবে বাস্কেটবল খেলে এসেছেন। তিনিও জানাচ্ছেন, পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যেভাবে লিঙ্গ নির্ধারণে না বসে সেরা সফল মুখগুলিকে সবদিক থেকেই তৈরি করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং কর্মপদ্ধতি রয়েছে তা ভারতের বুকে ভাবাই যায় না। কিন্তু তবু যাঁরা সেই প্রতিবন্ধকতাকে দূরে সরিয়েই ব্যক্তিগত দক্ষতার শীর্ষে থেকেই এগিয়ে চলেছেন তাঁদেরকে নিয়েও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির হেলদোল নেই। ফলে যেচে কোন্‌ বিজ্ঞাপনদাতাই বা এসে হাজির হবে!
আসলে ঝামেলাটা পাকিয়েছে অন্যত্র। খুব ভালোভাবে বাজার যাচাই করে ধরা পড়ছে, যে পরিমাণ বিজ্ঞাপনী বিনিয়োগ পেতে পারতেন গীতু অথবা নেহা, তার সিংহভাগ চলে গেছে বলিউডের চটুল নায়িকামহলে এবং বাদবাকি অংশ টেলিভিসনের সুদীর্ঘ সোপ অপেরারকুশীলবদের আরো জনপ্রিয় করার কাজে।ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস গ্রুপের দক্ষিণ এশীয় বিভাগের অধিকর্তা রিশ কৃষ্ণমাচার বলছেন,‘সচরাচর খেলাধুলার জগতে দুটো আবেদনে আমাদের বেশি নজর থাকে। একটা যদি মাঠে পারফরম্যান্সের উৎকর্ষতা হয়ে থাকে, পাশাপাশি দেখে নিতে হয় টেলিভিসনের সামনে হাঁ করে বসে থাকা এক বিশাল সংখ্যার মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কতোটা থাকছে। সেখানে বারবার করে যুবরাজ বা শচীনের চাহিদা যে উত্তরণের দিশা দিচ্ছে বিনিয়োগকারীদের, সেখান থেকে মুখ অন্যদিকে ঘোরার তাগিদই অনুভূত হচ্ছে না। বলতে পারেন, বাজার ধরার কারণেই মহিলাদেরও যেভাবে তুলে আনার দরকার ছিলো সেটাও গেছে হারিয়ে নিতান্তই অনিচ্ছার কারণে। অর্থাৎ ঘুরে ফিরে সেই...!
তাহলে? না, এমন কোন প্রশ্ন তোলাই অসঙ্গত এখানে। আই পি এলর ভরা বাজার, বলিউডের বাছাই করা নায়ক-নায়িকার দলের হাতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা এবং সেই টাকাকে অন্য পথে খাটিয়ে আরো বিত্তশালী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় যে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে গ্ল্যামার দুনিয়া’,সেখানে কুৎসিত, কালো রঙের চোখমুখ অথবা নিয়মিত হরেক বাধার সঙ্গে যুঝতে যুঝতে তোবড়ানো গালের মেরি কোমের জায়গাই হচ্ছে না সামনে আসার। এবং খুব তাড়াতাড়ি সেই সুযোগও যাবে জুটে তারও কোন লক্ষণ নেই।
কোন্‌ বিজ্ঞাপনে যেন রোজ দেখানো হয়,‘ফাস্টার, হায়ার অ্যান্ড স্ট্রঙ্গার। গাছের ডাল ধরে যে মিষ্টি মুখটা দোল খায় আর মায়ের হাতে সুস্বাদু পানীয়র লোভে এক ছুটে হারিয়ে দেয় ভাইকেও। টেলিভিসনের সামনে বসে কেমন যেন একটা অলীক চিন্তায় ভরে ওঠে মন। তারপর চলে আসে আরেকটা বিজ্ঞাপন। বোঝা যায়, ব্যাপার যাই হোক, ওদের জন্য খাটে না এই শর্তগুলো! যত্তো সব ভাঙা মুখের দল!

No comments:

Post a Comment