Monday, March 8, 2010

আজ দিনটা মেয়েদের!

প্রতিদিনই ঘুম ভাঙে দেরিতে।

আগে শুলেও যা, শেষ রাতে শুতে গেলেও একই চেহারা।

ঘুম ভাঙে প্রতিদিন রেডিওর গাঁকগাঁক করা শব্দে। আমাদের ঘরের রেডিওটা আবার বেয়াড়া ধরণের। কখনও অ্যায়সা জোরে হাঁক দিয়ে ওঠে, পাশের বাড়ির লোকেও চমকে উঠতে বাধ্য। পরমুহূর্তেই আবার শব্ট টব্দ কোথায় হাওয়া। অতি ক্ষীণ এক শব্দতরঙ্গে ভেসে আসে। অতি কষ্টে কান পেতে তা শুনতে শুনতে কখনও সখনও মনে পড়ে যায় মাধ্যমিকে পড়া পদার্থবিজ্ঞানের শব্দ চ্যাপ্টার। মনুষ্যেতর প্রাণীদের কান খুব সহজ, অতি দূরবর্তী শব্দও ভেসে আসে তাদের কর্ণপটহে।

ফিক করে নিজের মনেই তখন হেসে মনে মনে বলে ফেলি,‘শালা, জীবনে কিছুটা সময় কুকুর হয়ে থাকাও খুব জরুরী ছিলো!’ খুব কষ্ট করে চোখটা সামান্য একটু ফাঁক করে জানলা দিয়ে গায়ের ওপর পড়া নরম রোদের ছোঁয়া নিতে নিতে বিড়বিড় করি,‘বাব্বা! এই হলো গিয়ে শব্দব্রক্ষ্ম’! রামপ্রসাদী দিয়ে শুরু হয়ে শাম্মি কাপুর ঘুরে সাড়ে সাতটায় গানের কলি ঢুকে পড়ে আমীর-শাহরুখে। মাঝে ‘ফিল ইন দ্য ব্ল্যাঙ্কসের’ মতো টলিউডি ঝঙ্কার। চলে পাল্লা দিয়ে ‘আজকের সকালে, কী আছে কপালে’! আমি তো শুধু মন দিয়ে শুনি ‘মেষ’ রাশি কী বলছে। এই চল্লিশে পা রেখে তো সার বুঝেছি নিজের থেকে এতো ভালো এবং উন্নত ‘মেষ’ দ্বিতীয় একটিও নেই!

ঘুম আজও ভাঙলো। ভাগ্যিস ছেলের পরীক্ষাটা শেষ হয়েছে, তাই খানিকটা স্বস্তিতে পাশ ফিরে শোয়ার সুযোগ মিলেছে বিচিত্র সুরতরঙ্গে হাবুডুবু খেতে খেতেই কানে ভেসে এলো,‘আজ বিশ্ব নারী দিবস। তামাম মহিলাকে জানাই সেলাম’! অন্যদিন যাও বা একটু জোরে রুমাকে হাঁক দিয়ে ডেকে চায়ের কথা বলি। আজ হাঁক দিতে গিয়েও চুপ করে গেলাম। আজ বিশ্ব নারী দিবস। নিজেকে চাপা গলায় বলে ফেললাম,‘ চেপে যাও গুরু, দিনটা আজ অন্য !

আমার পাঁচ বছরের বিচ্ছু ছেলে রিকুকে দেখভালের জন্য রয়েছে কাজের মেয়ে। দিন প্রতি পঞ্চাশ টাকা, না এলে টাকা নেই। কতোটা কী করতে পারবে তা ঠিক হওয়ার আগেই মুখে মুখে পাকা হয়ে যায় চুক্তি।দেখো, পরে আবার এসব নিয়ে ঝামেলা করো না। সারাদিন যে খাটাখাটনি যায়,ওসব শুনতে আর ভালো লাগে নাবারবার করে ওই কথাটা রুমার মুখে শুনতে শুনতে আমারও মুখস্থ হয়ে গেছে। থুড়ি! আমার ছেলেও কণ্ঠস্থ করে ফেলেছে!

দত্তাবাদের এঁদো বস্তি থেকে রোজ দশটায় নিঃশব্দে বাড়িতে ঢুকে শুক্লা সোজা চলে যায় পিছনের বাগানের কলে পা-হাত ধুতে। কাজের লোকের স্ট্যাটাসই আলাদা। মানে মুখে যা বলছি, মন থেকে তাকে মানার কোন প্রশ্নই ওঠে না। ফলে স্পষ্ট একটা ব্যবধানরেখা টেনে দিয়েই ওই ঝামেলা মিটিয়ে ফেলাই বুদ্ধিমানের লক্ষণ! তো সেই শুক্লা হাত-পা ধুয়ে চলে আসে সোজা ঘরে,‘দাদা, ভাই কি খাবে? আজ কি আপেল না আঙুর?’ রিনরিনে গলায় শব্দে চমকে উঠি রোজ। মুখটা শুকনো,পরনে আটপৌরে শালোয়ার কামিজ, কোনদিন আবার লম্বাটে ফ্রক। শুরু হয়ে যায় একই দিনের মধ্যে আরেকটা দিন। আমি মালিক,তুমি ভাই মাইনে করা কাজের লোক! তুমি মজুর ,আমি মালিক!

নিজের সঙ্গে প্রতিদিন বিস্তর ধস্তাধস্তি করেও শুধরাতে পারলাম না মেজাজ। না বলা ভালো, প্রথাগত মানসিকতার তিরিক্ষেপনাকে। কাজের লোক এলেই অহেতুক কিছু ব্যস্ততা ভর করে মাথায়। হয়তো তেমন কিছু দরকারী নয় তবু শুক্লাকে ডেকে চলেছি, কোন সাড়া নেই। মেয়েটা কি কালা? কোথায় গেলো? একরাশ বিরক্তি নিয়ে উঠে এসে এদিক ওদিক উঁকি দিয়ে দেখি, বছর বারোর মেয়ের উদাস চোখ জবা ফুলের গাছে। দেখে মাথা গরম হয়ে যায়। এতক্ষণ ধরে ডেকে চলেছি, কোন হুঁশই নেই। কী এতো ভাবে?

ব্যাপারটা কি? কালা নাকি ? ডেকে ডেকে গলা তো ব্যথা হয়ে গেলো। ভাইয়ের জামা প্যান্ট ধুয়ে ছাতে মেলেছো? চড়চড়ে রোদ রয়েছে,শুকিয়ে যেতো।সেই রিনরিনে গলায় কিছু একটা বলার চেষ্টা করেও আটকে গেলো কথা। মাথা নিচু করে বালতি নিয়ে কল পাড়ে। তাহলে যে রোজ নিজের সঙ্গে এতো লড়াই করি, তর্ক করে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করি! সব তাহলে বৃথা। যা ছিলাম তাই আছি! শুধু আজকের দিনটাতে বিশ্ব নারী দিবস।

একতলা থেকে বাড়ির উচ্চতা বেড়ে হচ্ছে দোতলা। সারাদিন ধরে ধাই-ধপাস, খট-খটাস। বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস। বাবার বিস্ফারিত চাউনি এবং মাঝেমধ্যেই অবসরকালীন সঞ্চয়ের বেশ কিছু পাস বই বের করে গভীর মনোযোগে একই সংখ্যার মাঝে ভারসাম্য খুঁজে বেড়ানো। এই গরমেও মা’র শীতকাতুরেপনা গেলো না। দুপুরের ঠা ঠা রোদেও চেয়ারে গা এলিয়ে ঘুমানোর সার্থকতা বিচার করা দুষ্কর। ডেকে দিলে কোনক্রমে টলমল করতে করতে বিছানায় শুয়ে পড়েই বলে ওঠে,‘কই রে, কম্বলটা কোথায় গেলো?’

সেই করুণাময়ী থেকে রোজ হেঁটে যে মহিলা বস্তার পর বস্তা বালি মাথায় চাপিয়ে একতলা-দোতলা করে বেড়ায়, ওকে দেখলেই কেমন যেন এক্কা-দোক্কার কথা মনে পড়ে। মাপ করে দাগ কেটে দেওয়া গণ্ডীর মধ্যেই ঝুপ করে পার হয়ে যায় চব্বিশটা ঘন্টা। ওর নাম সরমা।

কালো রঙ। রোদে পুড়ে চামড়া জ্বলে রঙটা আরো কেমন যেন পাংশুঁটে। মুখে সর্বক্ষণ তলবের কচকচানি। একদিন তো দেখলাম আবার একমনে বসে খৈনি ডলছে,আমাকে দেখেই হাত-টাত ঢেকে গলায় থুতু আটকে যাওয়ার দশা। ‘কি গো দিদি এই যে বলো এতো অভাব তাহলে সারাদিনে এই তলব গেলো কেন’?

ঘোলাটে চোখে অদ্ভুত এক হলুদের আভা। কালো মুখে চোখদুটো যেন আরো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।‘কী করবো গো ভাই,ঘরে দুটো মেয়ে। স্বামী তো রিকশা চালায়। সারাদিনে এই খাটনি, শরীর টানতে হবে তো’! এও এক বিচিত্র ব্যাখ্যা! ভালো বললে ভালো, না হলে কারই বা কী আসে যায়! অস্বস্তি কাটাতে নিজেই দারুণ মনোযোগীর ভান করে দেখতে থাকি সদ্য প্লাস্টার করা দেওয়ালের মসৃণতা কতোটা হলো!

‘দাদা,বৌদিকে বোলো না কয়েকটা ব্লাউজ দিতে। সবই এমন ছিঁড়ে গেছে যে পরা যায় না’। হাত তুলে তার দশা দেখানোর বহর দেখে বলে ফেলি,‘থাক, থাক আর বলতে হবে না। দেখবো’.... বলতে বলতে আমিও সোজা চম্পট ছাদ ছেড়ে নিজের ঘরে। রুমাকে এসে বলি,‘তোমার যে কয়েকটা ব্লাউজ ছিঁড়ে গেছিলো বলছিলে, দিয়ে দিও তো সরমাদিকে’। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা গেলো, সেটা গত মাসেই চলে গেছে রান্নার মহিলা কাজলের জিম্মায়।‘তাহলে ওর কপালে কিছু জোটার নয়’। রুমার গলায় প্রচ্ছন্ন উষ্মা,‘আমারই বা কতো আর ব্লাউজ রয়েছে। পরে দেখে দিয়ে দেবো।’ উত্তরেই বুঝে যাই ‘চ্যাপ্টার ক্লোজড’!

গরম, অলস দুপুরে টেলিভিসনের রিমোট ঘোরাতে ঘোরাতে চোখ আটকালো কোন এক চ্যানেলে। আমাদের কলেজের দিন পার হয়ে আসার সময়ের জনপ্রিয় হিন্দি ছবির দুর্দান্ত এক মেলোড্রামাটিক সিন’! তখন তো এক টাকা পঁয়ষট্টি পয়সার সিটে বসে, সারসের মতো ঘাড় তুলে হাঁ করে গেলা নায়কের দাদাগিরি,ওদিকে চোখ খুঁজে ফেরে নায়িকার দেহের ছিঁটেফোঁটা গোপন নির্যাস। টানটান উত্তেজনায় ঘেমে নেয়ে একাকার!

এখন বিজ্ঞাপনের বিরতি। দর্শকের দিকে বিচিত্র ঢঙে দাঁড়িয়ে থাকা মাধুরী দীক্ষিতের স্থির চিত্র। ঝলমলে চেহারার এক তন্বীর মুখে ধারালো হাসি,‘আপনিও চান নাকি এমনই ঈর্ষণীয় নিতম্ব? ভাববেন না, নিয়ম করে একটু সময় বের করে নিয়ে শরীর পরিচর্যায় মন দিন। দেখে নিনক্যামেরা ঘোরে। আরেক সুবেশা কন্যা শরীরে এঁটে বসা পোশাক পরে হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে দিয়ে একবার বসছেন, আবার উঠছেন। তন্বী এগিয়ে যান,কন্যার কোমর ধরে বুঝিয়ে দেন কতোটা সতর্ক এবং সচেতন হয়ে সেই ওঠ বোস করতে পারলে শুধু সুদৃশ্য নিতম্বদিয়েই বাকিদের শ্বাস তুলে দিতে পারেন অথবা বাড়িয়ে দিতে পারেন রক্তচাপ! বুঝলাম আজ নারীদের দিন। যতো পারুন শিখে নিন!

বাসে সেই পরিচিত মেয়েদের গা ছুঁয়ে যাওয়ার অন্যমনস্ক ইঁদুর দৌড়কেউ সহ্য করে, কেউ অগ্নিবর্ষণ করেন চোখেকেউ আবার আরো উদাসীন। হয়তো বা কম্রোড়োমাইজকরার চরমতম শিক্ষা রপ্ত করে ফেলেছে।

পূরবী সিনেমার গেটের পাশে প্রতিদিনের মতো আজও সেই বিশেষমুখগুলো।মস্তি মারবে আর গুনে পয়সা দেবে না। শালা!...ছেলে!অনায়াসে অপরিচিত দুই ক্রেতা-বিক্রেতার মায়েরা পেয়ে যায় একাসন! মৌলালির মোড় থেকে চলন্ত বাসে প্রতিদিন লাফিয়ে ওঠা তিন বোনের আকুতি। হাতের মধ্যে দুটো পাথরের চাকতিকে অদ্ভুত কায়দায় ধরে নিয়ে বোল তোলে দমকে দমকে। মেরি প্যারি বেহনা বনেগি দুলহনিয়াথেকে মন মানে না’!

মাথায় চুলের দুর্বোধ্য জট, নাক দিয়ে সর্দি গড়িয়ে পড়তে পড়তে এখন শুকিয়ে কাঠ! নোংরা, ধুলেমাখা হাত পাট ভাঙা ধবধবে প্যান্টের ওপর বারবার এসে পড়ে,‘দে না ভাইয়া। কুছ ভি খায়া নেহি’! মাথা গরম। সবে লন্রিধা থেকে কাচিয়ে আনা! জনসংখ্যার বাড়বাড়ন্ত থেকে বিশ্বায়ন, উদারীকরন থেকে কেন্রীগ্য় সরকারের বাপবাপান্ত আর সবশেষে নিষ্ফল আক্রোশে মনে মনেই বলে ওঠা বাঞ্চোত’!

এখন রাত। গভীর রাত। মধ্যরাতের শহর চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। শিয়ালদা স্টেশনের সামনের পানের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা রাতের অতিথির বুকে হাত দিয়ে যায় গণতন্রেরের প্রহরী। অধিকার আছে ভাই। পুরোদস্তুর সাংবিধানিক হক!

পানের দোকানে বসে থাকা বুড়োর চোখে চকচকে লালসা। হ্যা হ্যা করে হাসতে হাসতে চলে যায় মুটে, মাথায় আলুর বস্তা চাপিয়ে। সেই একঘেয়ে ছবিগুলো রোজ দেখতে দেখতে চোখে নামে আঁধার। ঘুম পায় আর ক্রমশ ক্লান্ত হতে থাকা স্নায়ুতন্রেতির বিবশতায় হারিয়ে যায় সমস্ত চেতনা আর বোধ।

চলে যায় আরেকটা মেয়েদের দিন!

No comments:

Post a Comment