Tuesday, January 26, 2010

মহা-সৌরভ-রাজ
ইন্দ্রনীল দত্ত
টুকরো টুকরো সেই ছবিগুলো এখনও অমলিন। ভেবে দেখলে তা কোনদিনই হারিয়ে যাবে না স্মৃতির ধূসর পাণ্ডুলিপির ধুলোয়। তা হারিয়ে যেতে পারে না।
নাগপুরের প্রাইড হোটেলের গোটা চত্ত্বর জুড়ে শুধু ভিড় সংবাদমাধ্যমের। একদিকে নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি রকমের ব্যস্ততা, অন্যদিকে তাঁর বিদায় বেলার সঙ্গী হতে প্রচুর মানুষের ঠাসা ভিড়। একবার, শুধু একবারের জন্য কী সাক্ষাৎ মিলবে না তাঁর? খুব কাছে যেতে না পারলেও ভিড়ের ভিতর ঠেলেঠুলে এগিয়ে গিয়ে বাড়িয়ে দেওয়া খাতা।। একটা সই, ওটাই অতি যত্নে তোলা থাকবে ব্যক্তিগত সংগ্রহে। লোককে বড় মুখ করে বলা তো যাবে,‘এই দ্যাখ, সেই মানুষটার হস্তাক্ষর যে কীনা সারাটা সময় জুড়ে শুধু অসম্ভবের সঙ্গে লড়াই করে তাকেই ফেলে দিয়েছিলো চরম লজ্জায়!’
অনেকের সঙ্গে সেই মুহূর্তের সঙ্গী হওয়ার সুযোগ হয়েছে এই প্রতিবেদকেরও। পেশাদারী মানসিকতা বারবার করে বলে যাচ্ছে যেভাবেই হোক পত্রিকার জন্য পাঠাতে হবে বিশেষ সাক্ষাৎকার, অন্যদিকে মনের ভিতর কোথায় যেন কিছু একটা হারানোর তীব্র যন্ত্রণা! সবকিছুকে সংযমের আগড়ে বেঁধে হোটেলের রিসেপশন থেকেই মোবাইলে ফোন,‘দাদা, আমার নম্বর কখন আসবে’? প্রশ্নের বহর শুনে উল্টোপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো হালকা হাসির রেশ,‘আরে, সোজা চলে এসো স্যুইমিং পুলের ধারে। গোটা ভারতবর্ষকে সামনে নিয়ে বসে আছি, তুমিও চলে এসো। বাংলা বরাবর আমার কাছে এক নম্বরে’! তড়িঘড়ি করে সেখানে পৌঁছে চোখে পড়লো সত্যিই এক বিরল দৃশ্য। আক্ষরিক অর্থে মিনি ভারতবর্ষের ছবি। সার দিয়ে বসে দেশের প্রায় সব প্রান্ত থেকে উড়ে আসা সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। তিনি এক এক করে সবার সামনে হাজির হচ্ছেন। কোন বিকার নেই, নেই বিরক্তির ছোঁয়া। পরিচিত হাসি ধরে রেখে ঠায় জবাব দিয়ে চলেছেন বহু ব্যবহারে ‘ক্লিষ্ট’ সেই প্রসঙ্গগুলোর যা তাঁকে সববসময় ধাক্কা দিয়ে গেছে ভিতরে ভিতরে!
‘দাঁড়াও, আগে ওদেরটা আগে সেরে ফেলি, বাংলার জন্য বিশেষ সময় বের করে রেখেছি। আর তো কটা মুহূর্ত, তারপর কে, কতোবার আমার কাছে আসবে, ঢের জানা আছে। ভাবতে পারো, এরাই একদিন আমার মুণ্ডুপাত করে বলছিলো ভারতীয় ক্রিকেটকে বাঁচাতে আমাকে ঘাড় ধরে বের করে দিতে হবে।আজ ওরাই আবার সব ভালো মুখ করে, সমবেদনা প্রকাশ করে ঠায় বসে একটা কথা শোনার জন্য। সত্যি, কতো অভিজ্ঞতাই না হলো!’
হ্যাঁ, ইনিই সৌরভ ‘মহারাজ’ গাঙ্গুলি। ভারতীয় ক্রিকেটের ‘মহাদাদা’। প্রাদেশিকতার সংকীর্ণ প্রাদুর্ভাবকে হেলায় দূরে সরিয়ে ভয়ঙ্কর তেজে উদ্ভাসিত এমন এক চরিত্র যাঁর বহুমুখীতা নিয়ে অনায়াসে চলতে পারে এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা। শুধুই কী ক্রিকেট? তার বাইরে পড়ে থাকা বিশাল প্রান্তরে লুকিয়ে থাকা হাজারো পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বেড়ে ওঠা এক এমন আগুন যার ছোঁয়ায় প্রথাগত সব ভাবনাগুলো জ্বলেপুড়ে একাকার হয়ে জন্ম হয়েছে এমন এক মানসিকতার যা বলতে শিখিয়েছে, লোকে কী বলছে তার থেকে অনেক বেশি মূল্যবান আমি নিজে কী ভাবছি। হ্যাঁ, কোথায় যেন সেই বহু প্রজন্ম আগে বিশ্বের বুক চিরে উঠে আসা সেই মানুষটার মতো যাকে দুনিয়া জানতো কেসিয়াস ক্লে’র নামে,‘পৃথিবী আমাকে যেভাবে চায়, আমাকে তা হতে হবে কেন? পরের শৃঙ্গটা কী হবে সেটা আমিই ঠিক করবো’! সৌরভ গাঙ্গুলি ভারতীয় তথা বিশ্বক্রিকেটের সেই ‘অভিজাত, বহুমাত্রিক বৈশিষ্টে ভরপুর এক বর্ণময় মুখ’। না, এ আমার, আপনার মনগড়া কোন উপমা নয়, এমনভাবেই বড় আদরের ‘দাদি’কে ব্যাখ্যা করেছেন ভারতীয় তথা বিশ্ব ক্রিকেটের আরেক শৃঙ্গের অধিপতি সুনীল গাভাসকার! এবং যাঁকে নিয়ে পাতার পর পাতা অনায়াসে লিখে ফেলা যায়, আবার কিছু ঘটনাকে রকাশ্যে আনা যায় না বিতর্কের চক্র এড়িয়ে যেতে।
তাহলে আজ কী মূল্যায়ণে বর্ণিত হবে এমনই এক চরিত্রের। তিল তিল করে সযত্নে লালিত সেই ক্রিকেটীয় বাসনা যা সেইসব মানুষদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিয়ে যায়, যে বঞ্চনা তাঁদের প্রতি করা হয়েছে তার অনায়াস জবাব দেওয়া সম্ভব। প্রবল এক আত্মপ্রত্যয়ের চোখ ঝলসানো বিচ্ছুরণে সেই নিন্দুকদের রাতারাতি অন্ধ বানিয়ে দিয়ে নিজেকে তুলে ধরা যায় এক সু-উচ্চ শিখরে যার দিকে মাথা তুলে তাকাতে গেলে কোথায় যেন থেমে যায় দৃষ্টি। শেষ অবধি নজর গিয়ে আর পৌঁছায় না! সেই হার না মানা মেজাজটাই সৌরভ গাঙ্গুলি নামক এক মানুষের গোপন রসায়ন। শুধু ক্রিকেটীয় শৃঙ্গজয় বলেই নয়, পাশাপাশি ভারতীয় ক্রিকেটকে আঞ্চলিকতার হাত থেকে টেনে বের করে এনে হাজির করেছিলেন এমন কিছু মুখের সারি , আজ যাদের ভিতর সবাই দেখতে পাচ্ছেন ‘নতুন ভারতের’ ছোঁয়া। মাহীন্দ্র সিং ধোনি অথবা যুবরাজ সিং, বীরেন্দ্র সেওয়াগ অথবা জাহির খান, হরভজন সিং অথবা সদ্য সাড়া জাগানো ঈশান্ত শর্মা। সৌরভেরই হাত ধরে কোন না কোন সময়ে এমনভাবে এই নামগুলির আত্মপ্রকাশ যার ‘প্রথম শো’ আদৌ হিট করবে নাকি নিখাদদ এক ‘ফ্লপ শো’র আকার নেবে, একটা সময় সেটাই ছিলো সবার আলোচ্য। কিন্তু ওটাই সৌরভ গাঙ্গুলির চ্যালেঞ্জ। দল তৈরি হবে অথচ তাকে দেখে মনে হবে কেউ দয়া করে তা হাতে তুলে দিয়েছে, সেটাই বা কী করে হজম করে নেবো অধিনায়ক হয়ে? ফলে ওই বহুদিন ধরে চলে আসা প্রাদেশিকতার লেবেল লাগানো দলের তকমা মুছে ফেলে হাজির করতে হবে একদল এমন সমস্ত দামাল ছেলেদের যাদের মাঠের ভিতর সামলাতে নাভিশ্বাস উঠে যায় প্রতিপক্ষের। স্টিভেন রজার ওয়া’র মতো লৌহকঠিন মানবও স্বীকার করে নিয়েছিলেন,‘বাপ রে! একটা দল করেছে বটে! নিজেও যেমন ডাকাবুকো, সঙ্গীগুলোকেও সেই ছাঁচে ফেলে একেবারে তপ্ত লোহাতে পরিণত করেছে। যাবে, এই ভারতীয় দলটা বহুদূর যাবে’।
কতো কীই না ঘটে! সামগ্রিকতার বিচার করতে বসলে সৌরভ গাঙ্গুলির পরিপূর্ণতা এবং প্রাপ্তি খুব সম্ভবত বাকিদের তুলনায় অনেক, অনেক বেশি। সেই ভারতীয় ক্রিকেটের অন্দরে প্রথমপ্রবেশের সময় থেকে শুরু করে বিদায়বেলাকার বিষণ্ণতা, সব জায়গাতেই সৌরভ একাই একশো!
সেই ত্রিনিদাদের চড়চড়ে রোদে একা গ্যালারিতে বসে থাকা। বাংলাদেশের কাছে প্রথম ম্যাচে হেরে ভারত কার্যত বিদায় নেওয়ার দুঃপ্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছে। গোটা ভারতীয় দল অনুশীলনে ব্যস্ত, সৌরভই শুধু বসে গ্যালারিতে। ওই চ্যাপেল রাজেরই অনুশাসনের ফল! এখনও কানে বাজে সৌরভের সেই মন্তব্যটা,‘তোমরা হয়তো সেভাবে বিশ্বাস করতে পারছো না তবে আমার মন বলছে এবার আমরা খুব তাড়াতাড়ি এখান থেকে বিদায় নেবো। হয়তো বা প্রাথমিক পর্ব থেকেই!’ আনমনে, বিড় বিড় করে বলে যাওয়া সেই কথাগুলোর ফাঁকে মহারাজের দু’চোখে অপার শূণ্যতা কোথায় যেন ধাক্কা দিয়ে গেছিলো আমাদের মতো গুটিকয় বাংলার সাংবাদিকদের চেতনায়।‘আসলে দলটা তো অখণ্ড মেজাজ নিয়েই আসতে পারেনি। প্রত্যেকে একেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের আকার নিয়ে এখানে খেলতে এসেছে। বিশ্বকাপের মতো আসরে সেই বিচ্ছিন্নতাকে কে প্রশ্রয় দেবে!’ ভারতের করুণ বিদায়ের পর চ্যাপেলও বলে ফেলেছিলেন, ওটা কোন দলই ছিলো না! বেহালার বীররেন রায় রোডের বাড়িতে বসে সৌরভ বলে উঠেছিলেন,‘কী মিলে গেলো তো!’
আবার এবারই অস্ট্রেলিয়াতে একদিনের দল থেকে বাদ পড়ার পর গোটা ভারত জুড়ে সোরগোল। এ কী করলো ধোনি? জানাই ছিলো, ধোনি এবং পারিষদরা তার বহু আগে থেকেই ‘দাদা’কে একদিনের দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য মরিয়া প্রয়াস শুরু করে দিয়েছে। ব্রিসবেনে বসে সৌরভ নিজেই অনুরোধ জানয়েছিলেন, শুধুমাত্র ওই একদিনের সিরিজটাতে খেলতে এবং তারপরেই নিজেই ঘোষণা করে দিতেন একদিনের ক্রিকেট থেকে সরে যাওয়ার কথা। আই পি এল’য়ে চেন্নাইতে ম্যাচ ধোনির বিরুদ্ধে। জিজ্ঞাসা করেছিলাম,‘এবারই তাহলে ওকে জবাব দেওয়ার কাজটা সেরে ফেললে হয় না!’ সৌরভ কেমন যেন অবাক হয়ে গেলেন,‘তোমরা বারবার করে মাহীকে কেন খলনায়ক বানিয়ে ফেলছো?আমি কী জানিনা, ওর কিছু করার নেই, ভারতীয় ক্রিকেটের মাথায় যাঁরা বসে রয়েছে তাঁরাই তো সবকিছু ঠিক করে রেখেছে আমাকে বিদায় জানানোর জন্য। মাহী তো তার উপলক্ষ্য মাত্র। ছেলেটা ধোনা না হয়ে রাম, শ্যামও হতে পারতো! মাহী কিন্তু লম্বা রেসের ঘোড়া, বহুদূর নিয়ে যেতে পারবে ভারতীয় ক্রিকেটকে’।
নানা সময়ে ভিন্ন আঙ্গিকে নিজেকে মেলে ধরা এমনই সৌরভ গাঙ্গুলির গভীরতা মাপতে যাওয়া বিশাল এক বোকামি। এতো পাকা এবং গভীর এবং স্বচ্ছ ক্রিকেটবোধ খুব কমই পেয়েছে পঁচাত্তর বছরে পা রাখা ভারতীয় ক্রিকেট। মনে আছে, মোহালিতে সৌরভের খেলা দেখতে আচমকা হাজির ভারতীয় ক্রিকেটের আরেক ডাকসাইটে ব্যক্তিত্ব মনসুর আলি খান পতৌদি বলে উঠেছিলেন,‘ছেলেটার ভাবনার তারিফ করতে হয়।মুহূর্তের ভিতর কীভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হবে, তা অনায়াসে শুধু ভাবেই না কাজেও তা লাগিয়ে দেয়। একেকটা সময় মনে হয়, আমার সময়েও যদি ওর মতো এমন একটা ছেলেকে পেতাম..!’ পাশে বসা ‘বিবি’ শর্মিলা ঠাকুরের সহাস্য মন্তব্য ছিলো,‘আরে বাবা, ঘরানাটা দেখতে হবে তো। হাজার হোক বাঙালির রক্ত লুকিয়ে রয়েছে। তার তেজই আলাদা!’
গড়পড়তা বাঙালীর মনে যে বিশ্ব জয় করার স্বপ্ন অহরহ জন্ম নেয় এবং তা মিলিয়ে যেতেও খুব সময় নেয় না, সৌরভ গাঙ্গুলি সেই ‘দুঃসাহসী, কল্পনাবিলাসী’ জাতির সেরা আইকন, যিনি কীনা বুঝিয়ে দিয়েছেন ওই মান্ধাতা আমালের ভাবনার কোন জায়গাই নেই আজকের এই রাস্তায়। ভারতীয় ক্রিকেটে ‘আমচি মুম্বাই’ তো এখনও শীর্ষে। খেলতে পারো ছাই না পারো, মুম্বাই থেকে উঠে আসার অর্থ প্রচণ্ড লড়াই করার মানসিক শক্তি নিয়েই সেই মুখের আবির্ভাব ঘটেছে। সে তুলনায় বাঙালীর ছেলে মানেথ তো মাথার ওপরে বল উঠলেই বাড়ির লোকের কথা মনে পড়ে যায়! সৌরভ এমনাভবে সেই প্রথাটা ভাঙলেন যার ভাষায় ব্যাখ্যা চলে না! এক অনুপ্রেরণা উদ্রেককারী চরিত্র যে কীনা প্রতিমুহূর্তে যে কোন ধরণের প্রতিকূলতার সঙ্গে সমানে সমানে লড়াই করতে তৈরি। এবং পাশে থাকা বাকিদের ভিতরও সেই মন্ত্র মগজে ভরে দিতে খুব একটা পরিশ্রমও করার প্রয়োজন অনুভব করেননি। প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে সেই অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করাটা এমন এক স্বভাবের আকার নিয়েছিলো যা বাকি সবাইকে ‘অন্যকিছু’ ভাবার জন্য বাধ্যই করে দিয়েছিলো। এবং প্রতিবারই বাজি জিতেছেন তিনিই!
ইতিহাস কতো কথাই না বলে! শোনা যায়, বাংলার বড়লাট লর্ড কার্জন নাকি বলেছিলেন,‘বাঙালির সাহস খরগোশের মতো আর বুদ্ধি গ্রিকদের মতো’! খুব স্বাভাবিকভাবেই বাংলা ভাগ করে ফেলার কারিগর প্রশংসা করে তেমন মন্তব্য করেননি। ‘দাদাগিরি’ ওখানেই প্রথম হেনেছিলো আঘাত। তবে সেটার শুরু তো সেই ১৯৯২ সালে, যখন কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি বেহালার বীরেন রায় রোডের এক বে-পরোয়া যুবকই একদিন ভেঙেচুরে একশা করে দেবেন ভারতীয় ক্রিকেটের মরচে পড়ে যাওয়া কাঠামো! মহাতারকাদের ভিড়ে বসে থাকা সেই প্রথম সফরেই আজহারদের ম্যানেজার রনবীর সিং মাহীন্দ্র বলেছিলেন মাঠে গিয়ে জল দিয়ে আসতে। ফোঁস করে উঠেছিলো প্রতিবাদসুলভ মনটা,‘জল বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতীয় দলে আসিনি। আমি কলকাতার মহারাজ’! ঘটনাটা এখন সঙ্গত কারণেই এড়িয়ে যান সৌরভ কিন্তু সেটাই ছিলো এক অতি-মানবিক চরিত্রের আগমনী বার্তা! ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো সেই সীমাহীন উদ্যম, উদ্ধত ক্রিকেটদর্শন, প্রতিভাদের খুঁজে বের করে তাদের সযত্নে লালন করার মমতা ভরা দৃষ্টি এবং নিজের তথা সঙ্গীদের প্রতি নিরবিচ্ছিন্ন বিশ্বাসবোধ। রাতারাতি পালটে গেলো ভারতীয় ক্রিকেটের ম্যালেরিয়া সুলভ কম্পন এবং নুইয়ে পড়া অবসাদের ঘোর। সৌরভের নিজের কথা ধার করে বলতে গেলে,‘শচীনকে বাদ দিলে ভারতীয় ক্রিকেটে বাকি সবাইকেই ছাপিয়ে যেতে পারি, সেই বিশ্বাস আমার ছিলো শুরু থেকেই। পরে ক্রমে বুঝলাম বাংলা থেকে খেলতে যারা আসে তাদের প্রতি শিবিরের ভিতরেই কোথায় যেন একটা শূণ্যস্থান থাকেই এবং সেখান থেকেই ওই আঞ্চলিকতার তত্ত্ব আরো জোরালো হয়ে পড়ে। ঠিক করে নিলাম, এমন একটা দল বানবো যাদের পোশাকের তলায় লোকানো থাকবে এ কে ৪৭, মুখে থাকবে অবিশ্রাম বুলি আর চোখে চোখ রেখে ভয় পাইয়ে দেওয়ার সাহস। এই দাদাগিরি না চালালে খুব মুশকিল!’
দাদাগিরি! না, সেটা বড় ‘খেলো’ হয়ে যায়। বলা ভালো, এমন এক উদ্ধত শাসক হাজির হয়েছিলেন যার পায়ের শব্দে ঘুম ছুটেছে বহু রথী, মহারথীর। এক অদ্ভুত দ্বৈতসত্তা নিয়ে সৌরভ গাঙ্গুলি রাজ করে গেলেন ক্রিকেটকে। কখনও খুব চেনা, অতি আদরের, প্রচুর ভুলে ভরা একটা আড্ডাবাজ ছেলের মেজাজ। আবার সেই রূপটাই একলহমায় বদলে যাচ্ছে বাইশ গজের ওই জমিতে পা রাখার পরেই। সেখানে পড়ে জবাব দেওয়ার হাজারো সব প্রেক্ষিত এবং হরেক সব বহুরূপীদের সার দিয়ে অপেক্ষায় থাকার মুহূর্ত। তাঁর আগে অনেকেই এসেছেন, লিখে গেছেন অনেক কাহিনী কিন্তু গল্প হিসাবে তার জনপ্রিয়তা অথবা প্রাসঙ্গিকতা ঠিক কতোখানি ছিলো সেই বিচার করার লোকেরই ছিলো অভাব। সৌরভ কিন্তু খুব কর্কশভাবেই তিনিই, ভালো সময়ে এবং খারাপ সময়েও। ওই যে কথায় বলে না, ‘মুরোদ’ থাকা চাই, ওটাই সতীর্দের পাশাপাশি ভারতীয় ক্রিকেটকেও নতুন করে শিখিয়ে দিলেন দাদা। ম্যাচ গড়াপেটার গাড্ডায় পড়ে নাভিশ্বাস তুলতে থাকা ভারতীয় ক্রিকেট যে আবারও ফিরে আসতে পারবে এবং এমন সাড়ম্বরে তা জেন কেউ ভাবনার ভিতরেই আনতে পারেননি। এক অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতা, সাঙ্ঘাতিক এক লোভের হাতছানি, রাশিকৃত বিতর্কের অনবরত তাড়া করে ফেরা। সেই প্রচণ্ড দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে সবাইকে টেনে বাইরে বের করে এনে সৌরভই দেখিয়ে দিলেন নতুন নিশানা। একটা রণহুঙ্কার, এবং তা ক্রমে এক বিশাল উচ্চতায় গিয়ে গিলে ফেললো বাকি সবকিছুকে।
একটা ভাবনা, একটা প্রতিবাদ, আর বিস্তর সব লড়াই। নিজেকে চেনানোর পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে থাকা সতীর্থদেরও তুলে ধরা ভিন্ন এক আঙ্গিকে। সৌরভ গাঙ্গুলির বিদায়ের পর আবার তা দেখা যাবে তো! গোটা একটা দল একই মনস্তত্ত্বে বিশ্বাস করে উড়িয়ে দিচ্ছে যে কোনধরণের প্রতিরোধ, পায়ের কাছে এসে নতজানু হয়ে পরাজয় স্বীকার করে নিচ্ছে তাবড় দলের তাবড় নায়করা। সেই ছবিটা আবার ফিকে হয়ে যাবে না তো! হোক বা না হোক, সেই সুগন্ধটা বোধহয় আর ফিরে পাওয়ার নয়। করাচিতে পাকিস্তানকে টেস্ট সিরিজে ঘায়েল করে হোটেলের লবিতে ঢুকে সৌরভ গাঙ্গুলি হুঙ্কার ছেড়েছিলেন,‘মুগাম্বো আব খুশ হুয়া!’ হাজির হোটেলের আধিকারিকরা পর্যন্ত এসে সেই হুঙ্কারে গলা মিলিয়েছিলেন! অথবা বেঙ্গালুরুতে প্রবল নিরাপত্তার ধাক্কায় ভিড়ের ভিতর পড়ে যাওয়া এক বছর আষ্টেকের ছোট্ট মেয়েকে কোলে বসিয়ে অটোগ্রাফ খাতায় পরপর সই দিয়ে যাওয়ার পরিতৃপ্তি ( পরে যা নিয়ে বলেছিলেন, ওকে দেখে আমার মেয়ে সানার কথা মনে পড়ে গেলো। সানা ওইভাবে পড়ে গেলে আমি কী হাতে হাত দিয়ে বসে থাকতাম!)। না, খুব সম্ভবত সেই অমলিন মুহূর্তগুলোকে এখন শুধু নীরবে স্মরণ করে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন উপায়ই নেই!
নাগপুরে শেষ টেস্টের সময়েই একদিন আড্ডার ছলে প্রশ্ন করেছিলাম,‘ওই ১৯৯২ সালের পর আর ভারতীয় দলে জায়গা না পেলে কী করতেন’? সপাটে জবাব,‘কেন! ব্যবসায়ী হতাম’। কিসের ব্যবসা? সামান্য চিন্তা করে হাসতে হাসতে জবাব দিলেন,‘কাপড়ের ব্যবসায়ী হতাম। ইস! তাহলে তোমাদের সঙ্গে দেখাও হতো না, তোমরাও কেউ আসতে না আমার কাছে’! যদি তাই হতো, ভারতীয় ক্রিকেট কী হারাতো তার গতি? বড় কঠিন হয়ে গেলো বোধহয় প্রশ্নটা। তার থেকে ওই কেসিয়াস ক্লে’র কথাটাই আরো একবার উচ্চারণ করা ভালো,‘পুনরাবৃত্তি যদি দৃঢ়তার সঙ্গে করা যায়, তার থেকে জন্ম নেয় এক বিশ্বাস। এবং সেই বিশ্বাসে যখন জন্ম নেয় প্রত্যয়, তখনই ঘটনার শুরু’।
দাদা একচুলও নিজের বিশ্বাস থেকে নড়েননি। দাদা কিন্তু বাজি জিতেই বেরিয়ে গেলেন!