তোমাকে...এষাদি!
তোমাকে এখনও মনে পড়ে এষাদি!
বড়সড় মন্দিরে মহিলা পূজারী বা মূল পূজারীর সহকারীর ভূমিকায় কোন মহিলাকে দেখলেই আমার চোখে ভেসে ওঠে তোমার মুখ। সেই টানা টানা চোখের ভাসা ভাসা দৃষ্টি আজও কেমন যেন উদাস করে দিয়ে যায় একেকটা বিকেল অথবা স্তব্ধতায় ঢেকে যাওয়া শহরের রাস্তা দিয়ে খুব জোরে ছুটতে থাকা গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখতে দেখতে। কোথায় হারিয়ে গেলে?
আজও কী ভুলতে পারলাম! এষাদি, তুমি এখনও কোথা থেকে হঠাৎ করে ভেসে উঠে ফের হারিয়ে যাও ঘোর আঁধারে। বহু চেষ্টাতেও খুঁজে পাই না। হারিয়ে ফেলার সেই অব্যক্ত ব্যথা ধীরে ধীরে স্তিমিত করে দেয় ভাবনাকে। কোথায় গেলে? একটা ফাঁকা জায়গায় একবার সমুদ্রের ঢেউ আর রাশি রাশি বালি,পরের মুহূর্তেই খুব ঠাণ্ডা, বিশাল সব বরফে ঢাকা পাহাড়। এমন কোন জায়গা আছে বলে জানা নেই যেখানে একইসঙ্গে ওই বরফ ঢাকা তুষারশৃঙ্গের সঙ্গে সমুদ্রের বড় বড় ঢেউও রয়েছে। তবু তোমাকে দেখেছি সেই অপার্থিব পরিমণ্ডলেই।
*****************************************************
ভক্তিভাব আমার কোনদিনই ছিলো না, আজ নতুন করে সেই রোগ ঘাড়ে চাপারও সম্ভাবনা নেই। কী কারণে যেন কলেজে যাইনি, মাইমার জোরাজুরিতে একবার যেতে হয়েছিলো তেঘরিয়াতে লোকনাথ বাবার মন্দিরে। মাইমা খুব জোরে জোরে শানের মেঝেতে মাথা ঠুকে কী যে ক্রমাগত চেয়েই যাচ্ছিলো কে জানে! একঘেয়েমি কাটাতে কাটাতে এদিক-সেদিক তাকাতে তাকাতে চোখে পড়লো তোমাকে। পরনে টকটকে গেরুয়া শাড়ি, ফুল হাতা ব্লাউজ।কপালে বিশাল একটা লাল টিপ।তুমি ফুলের একটা ঝুড়ি নিয়ে সাহায্য করছিলে পুরোহিতকে।
বুকটা ধড়াস করে উঠলো। তুমিই তো? উত্তেজনা প্রশমিত করে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলাম,তুমিই! তাড়াতাড়ি উঠে যেতে যেতেই তুমি মুহূর্তে ব্যস্তসমস্ত ভাব নিয়ে চলে গেলে লাগোয়া একটা ঘরে। ওখানে বাইরের লোকের প্রবেশ নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র আশ্রমিকরাই পারেন তার ভিতরে যেতে। তাহলে তুমি এখানে?
এক লহমায় মনে পড়ে গেলো ছাড়া ছাড়া ছবিগুলো। সকালবেলায় সন্টুর দোকানের রকে বসে তিন নম্বর চা’টা শেষ করে মেজাজে ধরিয়েছি বিড়ি,হনহন করে হেঁটে এসে ডাকু পাশে বসেই ফোঁসফোঁস করে দম ফেলতে শুরু করলো।
‘কি গুরু, সক্কাল সক্কালই নিত্য’র মেয়েকে নিয়ে চরকি মারলে নাকি’?
‘ধ্যার শালা, ও মেয়ে আমাকে ছেড়ে কোথাও উড়বে না গুরু। মস্তি আছে না। আসলে সকালবেলাতেই এমন একটা খবর পেলাম যে...’।
‘কি হয়েছে রে? আবার কেউ পড়লো নাকি’? মাত্র সাতদিন আগেই সকালে কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলো বুলু। সকাল তখন সাড়ে ছ’টা হবে। শ্রীমানীপাড়ার মুখের মজে যাওয়া ডোবার সামনে রাজুর ছেলেরা খতম করে দেয় বুলুকে।প্রথমে মাথায় বোমা,তারপর বুকের ওপর বসে তিনটে গুলি! রাজু-বুলুর রেষারেষি কে না জানতো! তাই বলে ‘এলাকা আউট’ রাজু ওইভাবে বুলুকে মেরে দিয়ে যাবে,তা কেউ ভাবতেও পারেনি।
পুলিসে পুলিসে ছয়লাপ চারপাশ।সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ,কেউই কিছু দেখেনি! খাল কেটে কে,কবে কুমীর ডেকে এনেছে? এতো আবার দুই ‘অ্যান্টি-সোশালের ক্যাচাল’। এলাকা দখলের লড়াই। দেখলেই বা বলছে কে! বসে গেলো পুলিস চৌকি।সকাল-বিকাল বন্দুকধারীদের কড়া চোখে হরেক সন্দেহের আনাগোনা।আমাদের সন্ধ্যার আড্ডারও দফা রফা। তবে দিনচারেক পরে আবার যে কে সেই! পুলিস ফিরে গেলো তার জায়গায়,লোকে বুলুর স্মৃতি ভুলতে ভুলতে ব্যস্ত হয়ে গেলো ব্যক্তিগত আশা-নিরাশার জাল ছাড়ানোয়। তাহলে আজ সকালে কী এমন হলো?
‘জানিস, এষা চলে গেছে’!
ছোট্ট একটা কথা,অথচ কী ভয়ঙ্কর! গোটা শরীরটাই যেন মুহূর্তের জন্য দুলে গেলো! কি বলছে? বিড়িটা ধরিয়ে নিয়ে একটা হাল্কা টান দিয়ে ডাকু বলতে লাগলো,‘জানতাম এমনটাই হবে। শালা ওই মেয়ে’কে ধরে রাখা খুব কঠিন। বুলুও তো যেতো ওর কাছে...’। কথাগুলো আর কানে ঢুকছে না। শুধু দেখতে পাচ্ছি ডাকুর ঠোঁটটা নড়েই চলেছে কিন্তু আওয়াজটা দুর্বোধ্য ঠেকছে।
ভাসছে কিছু আবছা দৃশ্য। মিষ্টি হাসি। সন্ধ্যা হলেই এষাদির ঘর থেকে ব্যাডমিন্টনের নেট, আলো, র্যাকেট বের করে আনার ব্যস্ততা। কাজটা যতো আস্তে করা যায়, আরেকটু দেখা যায়। আলো-টালো লাগিয়ে একবার চা,সেটাও এষাদির হাতে তৈরি। দীপঙ্করদা হাফ প্যান্ট আর সাদা রঙের একটা গেঞ্জি পরে বেরিয়ে আসতো।পায়ে ধবধবে সাদা কেডস। দুটো ম্যাচ খেলেই দীপঙ্করদা পাশেই ক্লাবে বসে যেতো ব্রিজের জমাটি আসরে,আমি আর ডাকু জানলার ধারে গিয়ে এষাদিকে ডেকে চেয়ে নিতাম দেশলাই।‘তোরা বিড়ি ফুঁকিস আর দেশলাই রাখতে পারিস না’,কেমন যেন একটা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের সুর ছিলো সেখানে। তাহলে তুমিই বা রোজ রোজ তা যোগান দাও কেন?
আবার তেমনই এক সন্ধ্যায় এষাদির ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলাম বুলুকে। শুনেছিলাম,দেখলাম সেদিন। গায়ের জামাটা খুলে কাঁধের ওপর রাখা,মুখে জ্বলন্ত সিগারেট। দরজার সামনে এষাদির কোমরে আলতো হাত বুলাতে বুলাতে হাসছে বুলু। এষাদির মুখেও ছিলো হাসির রেশ।দুঃখের? প্রাপ্তির? যন্ত্রণার? আমাদের আসতে দেখে বুলু বলে উঠলো,‘ওই যে এলো সব বড় খেলুড়ে! পয়সা পাস কোথা থেকে যে এতো বড়লোকের খেলায় মেতেছিস’? চুপ করে রয়েছি। ডাকুটা ঠোঁটকাটা। বলে ফেললো,‘দাও না বস কিছু টাকা। শাটলগুলোর খুব দাম’। অবজ্ঞা ভরে দুটো একশো টাকার নোট ডাকুর হাতে গুঁজে দিয়ে বুলু বেরিয়ে গেলো। এষাদিও তাড়া দিলো,‘নে, বের করে নে। আমি আবার একটু স্নানে যাবো’।
এও তো দেখেছি,কিন্তু কোনকিছুই স্পর্শ করতে পারতো না আমার ভাবনাকে। শুনেছিলাম, বুলুর সঙ্গে এমনই সম্পর্কের কথা যেদিন জেনেছিলো দীপঙ্করদা,সপাটে নাকি থাপ্পড় লাগিয়েছিলো এষাদিকে। সেও শোনা ডাকুর থেকে। সত্যি না মিথ্যে তা নিয়ে যাচাই করতে প্রবৃত্তি জাগেনি। এমনটা তো অতি স্বাভাবিক। হয়তো আরো নাটকীয় কিছু হতে পারতো! তবে সেইসব হরেক সমস্যা আমার ভালো লাগায় ব্যাঘাত ঘটাতে দেয়নি। আসলে হবেই বা কিভাবে? বারবার করে বৃষ্টিস্নাত সেই শেষ বিকালে মিষ্টি হাসির কলরোল মাথার মধ্যে তুলে দিতো হিল্লোল!
‘...দীপঙ্করদাকে দেখলাম চুপচাপ বসে রয়েছে। শালা এ-ই হয়!’ডাকু তখনও বকেই চলেছে।
তাহলে সেই এষাদি এখানে! কেমন যেন একটা উজ্জ্বল আভা বেরিয়ে আসছিলো শরীর থেকে। সৌন্দর্য যেন আরো এক উচ্ছ্বলতা নিয়ে ঘিরে ফেলেছে এষাদি’কে। তবে কি আমাকে চিনে ফেলেই ইচ্ছা করে ঢুকে গেলো ভিতরে? হতে পারে! তবে এতোদিন বাদে আমার মুখ কি মনে থাকবে? দাঁড়িয়ে রয়েছি। আরেকবার কি বেরবে না এষাদি?
শানের মেঝেতে বিস্তর কপাল ঠুকে তখনই মাইমা এসে হাইমাই শুরু করে দিয়েছে,‘চল,এবার তো যেতে হবে। বাব্বাঃ, কম দূর! মনটা খুব ভালো হয়ে গেলো’। মাথায় তখন আমার আগুন জ্বলছে, হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির মুখ খুলে বেরিয়ে আসছে কাঁড়ি কাঁড়ি ঘটনা। মনে মনে মাইমারই বাপান্ত করতে করতে ফিরে এলাম।ছবিটা রয়েই গেলো!
*******************************************************
দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে চব্বিশটা বছর। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে তখন রীতিমতো লায়েক। বিড়ি-সিগারেটে হাতেখড়ি হয়ে গেছিলো মাধ্যমিকের আগেই। উচ্চ মাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে একদিন উঠেছি বাবুদের ছাদে। পকেট থেকে একটা ক্লাসিক সিগারেটের প্যাকেট বের করে বাবু আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বললো,‘টান’! টান মানে? নতুন করে টানার কি আছে? এট অস্বীকার করার উপায় নেই, সিগারেট টানতে তখন তো হাঁটতে হতো প্রায় মাইল খানেক! সঙ্গে আবার মৌরি,লজেন্স কতো কী! মামা আবার মুখে তামাকের গন্ধ পেলে চামড়া তুলতে এক সেকেন্ডও সময় নেবে না।
তাছাড়া বাবুদের ছাদ থেকে আমার মামাবাড়ির ছাদ দেখা যায় স্পষ্ট। মামাতো দাদা তখন নিয়মিত উল্টোদিকের বাড়ির মিত্রাদি’র সঙ্গে ‘দিল্লাগি’ করছে। আদর করে নাম দিয়েছিলো ‘জুলিয়েট’! কয়েকবার ‘খবরি’ হয়ে দিয়েও এসেছি গোপন চিঠি,সঙ্গে দাদার শিখিয়ে দেওয়া বুলি,‘ঘোষপাড়ার ইলেকট্রিক সাপ্লাই অফিসের গলিতে ঠিক সাড়ে পাঁচটা’!
এই রোমাঞ্চকর চিঠি চালাচালিতে আমার ‘ডাকহরকরা’ বনে যাওয়া ঠিক কতোটা যুক্তিযুক্ত ছিলো, সেটা অবশ্যই একটা জোরালো প্রশ্ন,তবে ক্লাস সেভেন থেকে খবরের কাগজে হরেক সিনেমা এবং তার নায়ক-নায়িকার নাম মুখস্ত করে ফেলা আর গরমের দিনে বিকালে ফুটবল পিটিয়ে সন্ধ্যাবেলায় রিঙ্কাদের পাতকুয়োতলায় গুজরাটি বৌদির গা ধুয়ে শাড়ি মেলার মুহূর্তটা লুকিয়ে না দেখতে পারলে যেন দিনটাই বৃথা গেলো! লুকিয়ে ‘হলুদ বই’ পড়ে শরীরে সে কী অস্বস্তি!
তো সেদিন বাবু ছাদে নিয়ে গিয়ে আসলে হাতে খড়ি দিতে চাইছিলো গঞ্জিকা সেবনের। সিগারেটের তামাক বের করে সেখানে গাঁজা ভরে কষে টান। এক টানেই মাথা হাল্কা!‘শালা, এরজন্য ছাদে নিয়ে এলি’,রাগে আমার মাথায় যেন আগুন জ্বলছে। শেষমেশ কীনা গাঁজা! কিছুতেই টানবো না, আর বাবুও ছাড়বে না। ‘ধ্যুর একবার টেনেই দেখ না। ভালো না লাগলে কে তোকে মাথার দিব্যি দিয়েছে’,বাবু প্রায় ঘাড়ের ওপর চেপেই বসলো। প্রচুর ধস্তাধস্তি করেও শেষমেশ হার মানতে হলো বাবুর কাছে। কষে একটা টান দিয়েই গোটা পৃথিবী অন্ধকার। চারপাশ ঘুরছে বনবন করে, চোখে সব ঠেকছে ধোঁয়ার মতো,মাথার মধ্যে যেন পাথর ভাঙছে কেউ। আমি তো পাগলের মতো বাবুকে খুঁজছি,হাতের কাছে একবার পেলে শালার যদি নাক না ফাটিয়ে দিই তো এক বাপের বেটা নই!
আমার ওই দশা দেখে বাবু ছাদের ট্যাঙ্ক থেকে মগে করে জল এনে আমার চোখেমুখে ছিটোতে শুরু করেছে।একটু সুস্থ হয়ে যখন সবকিছু ধীরে ধীরে ফিরছে আগের অবস্থায়,বাবু তখন পালটা ধমকাচ্ছে ,‘তোকে ওইভাবে কোঁৎ করে গোটা ধোঁয়া কে গিলতে বললো! এই দেখ আস্তে আস্তে টানতে হয়’। আমারই ফেলে দেওয়া গাঁজা ভরা সিগারেটটা কায়দা করে টেনে দেখাতে লাগলো ধোঁয়া গেলার কায়দা। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে আমি তখন খুঁজছি শক্ত লাঠিগোছের একটা কিছু...। ঠিক সময়েই হাজির এষাদি। বর্ষার শেষ বিকেলে যে অদ্ভুত একটা দুখী আলোয় ছেয়ে যায় গোটা আকাশ, রাজকন্যা এলো ভরা শ্রাবণের প্লাবনের মতো। একবার তাকিয়েই সব শেষ! বাবুদের ছাদের একেবারে গা ঘেঁসে বেণুদার বাড়ির ছাদে সেই শেষ আলোর আকাশে উচ্ছ্বলতা ছড়িয়ে দিয়ে এষাদির হাসির শব্দই গুলিয়ে দিলো সবকিছু।
-‘কি রে বাবু,ওকে সিগারেট না খাওয়ালেই নয়’। একমুঠো ঝলমলে হাসি ছুঁড়ে দিয়ে এষাদির ওই কথাটাই যেন আমাকে রাতারাতি তাতিয়ে দিলো।
-‘না, না। ও জোর করেনি,’ বলতে বলতে বাবুর হাত থেকে সিগারেটটা প্রায় কেড়ে নিয়ে আমি এবার টান দিলাম অতি সাবধানে,তারপর খুব আস্তে আস্তে ধোঁয়াটা টেনে নিলাম ভিতরে। মাথাটা আবারও চলকে গেলেও বুঝতে দিলাম না কিছু। তাহলে তো হেরে যাবো! কার কাছে? আজ ভাবতে গেলে নানান যুক্তি এসে আমাকেই তামাসার আইটেম বানিয়ে ফেলে, কিন্তু সেদিন ওই বৃষ্টিতে ক্লান্ত বিকালে এষাদিই আমাকে ফেলে দিলো নিজের সঙ্গে কঠিন এক যুদ্ধে। হারতে পারবো না। কিছুতেই না। একটু এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে এষাদি নেমে গেলো নিচে। গলা শুকিয়ে কাঠ,চোখদুটো যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু ওই ক্ষণিকের ঝিলিমিলি হাসির তরঙ্গে আমি হয়ে গেলাম নিঃস্ব!
ওই যে বলছিলাম, উচ্চ মাধ্যমিক দিয়েই রীতিমতো লায়েক। পাড়াতে খুব একটা সুনাম কোনদিনই ছিলো না। মুনমুনদের বাড়ির রকে বসে বিড়ি টানতে টানতে খিস্তির নিয়মিত অনুশীলন, বেলা সোয়া দশটা থেকে পৌনে এগারোটা পর্যন্ত রাজকুমারী আর মায়াপীঠের ডে-স্কুলের মেয়েদের উৎসাহ প্রদান। আবার কখনও কোন বন্ধুর ভাদ্র মাসের পচা গরমে পেকে যাওয়া খাজা আমের মতো গলে পড়া প্রেমকে ভরসা দিতে কোন মেয়ের চলন্ত রিক্সায় ছুঁড়ে দেওয়া চিরকুট।সঙ্গে চাপা গলায় নির্দেশ,‘জবাবটা যেন ঠিক সময়ে আসে’! আমাদের রাজুর তো আবার যে কোন মেয়েকে দেখলেই প্রেম পেয়ে বসতো! সে এক মহা ঝামেলা। বাবুলাল একদিন বলে ফেললো,‘শালাটাকে পাটবাড়িতে নিয়ে চল,চারপাশে ঠাকুমা-দিদিমারা থাকবে।সব প্রেম পিছন দিয়ে বেরিয়ে যাবে!’ কিন্তু কোন কারণে এষাদি সেখান দিয়ে একবার হেঁটে গেলেই আমার সব তালগোল পাকিয়ে একাকার।
ঘড়ির কাঁটা দশটা, এগারোটা পেরিয়ে বারোটা-সাড়ে বারোটা। বন্ধুরা যে যার খোপে ঢুকে গেছে, বারান্দা থেকে মাইমা অন্তত বার পাঁচেক হাঁক দিয়ে ফিরতে বলেছে।প্রতিবারই হাত নেড়ে বলি,‘আসছি’,কিন্তু পা আর সরতে চায় না। গেলো তো পোস্টাবিসের দিকে, ফিরতে এতো সময়ই বা লাগবে কেন? তাহলে কি ফিরে গেছে, দেখতে পেলাম না। তাই বা হয় কী করে? একবারও তো জায়গা ছেড়ে নড়িনি, চোখ ছিলো সামনের দিকে। তাহলে হয়তো অন্য কোথাও...। কীরকম যেন একটা ব্যথা নিয়ে ফিরে আসা। কোনক্রমে মাথায় জল ঢেলে ভাত খেয়ে বিকালের অপেক্ষায় এপাশ-ওপাশ করা।
ঠিকানাটা জেনে গেছিলাম। জেনে গেলাম ডাকুর থেকে।
‘কি ভাই, ফেঁসেছো নাকি’! ডাকু বরাবরই এমন।
‘ধ্যুর শালা! তোর খালি ওই এক কথা। আসলে সেদিনই দেখলাম’,আমি সতর্ক।
‘গুরু আমাদের পাড়াতেই থাকে। ওই তো লালুর দিদির একতলায় ভাড়া থাকে। তবে ভাই কপাল ফাটা, তোর নাম্বার লাগবে না’।ডাকু যথারীতি বেখাপ্পা।
জেনে গেলাম পুরো ঠিকানা। শ্রীমানী পাড়ায় বটতলার ধারে সুন্দর দোতলা বাড়িটা লালুর দিদির।তবে লালু বা লালুর দিদির থেকেও পাড়ায় অনেক বেশি পরিচিত বুলু। ক্লাস এইটেই প্রথম মার্ডার ইঁট ভাটার মালিককে, নিজের হাতে। তারপর জেল খেটে বাইরে এসে বুলু রীতিমতো ত্রাস।‘হপ্তা’ তোলা থেকে শুরু করে নির্লিপ্ত হয়ে মানুষ মারা যেন জলভাত বুলুর কাছে। সেই বুলুর দিদির বাড়িতে ভাড়াটে! শুনেই কেমন যেন মনটা ভারি হয়ে গেলো। আর কোন বাড়ি মিললো না! ডাকু তখনও বলে চলেছে,‘আরে ওই যে দীপঙ্করদা আমাদের সঙ্গে রাতে ব্যাডমিন্টন খেলতে আসে না, ওরই তো বৌ। গুরু খাসা মাল’!
দীপঙ্করদা আমারও অতি পরিচিত। প্রতিদিন সকালে রোজ সাড়ে আটটার সময় ব্যস্তসমস্ত হয়ে দীপঙ্করদার গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরিতে দৌড়ানোর ছবি অতি পরিচিত। আমরা তো ঘড়ি না দেখেই ‘টাইম’ বলে দিতে পারতাম শুধু দীপঙ্করদার দৌড় দেখেই। সে যাই হোক, আমার তো কোন রেষারেষি নেই কারোর সঙ্গে। একবার একটু দেখতে পেলেই হলো!
বিকাল হলেই নিয়মিত ঠেক বসে গেলো বটতলার ভাঙাচোরা রকে। কয়েকটা ইঁট-পাথর জোগাড় করে তৈরি হয়ে গেলো বসার জায়গা। সন্ধে নেমেছি কি নামেনি, নিত্যবাবুর মেয়ে রিকা পড়তে যাওয়ার নাম করে একটা চক্কর কেটে আসতো বসাক বাগানের মাঠের ধারে গোয়ালের পিছনে। ডাকু ওখানেই দাঁড়িয়ে।ফিরতে ফিরতে সেই সাড়ে সাতটা। ‘বুঝলি আজ যা দিলাম না...। কি রে, দেখা হলো’? ডাকুর প্রায় প্রতিদিনের সেই পরিচিত প্রশ্নগুলো যে বিরক্ত করতো না তা নয়, আবার এও ভাবতাম বন্ধু তো। কাকেই বা বলবে!
‘আচ্ছা অপু, তোর কেসটা কী বল তো? এভাবে তো পাগলা হয়ে যাবি? তুই শালা নিশ্চিত ফেঁসেছিস’,ডাকু বলে উঠলো।
‘না রে ভাই। আদৌ তেমনটা নয়’। বলবো না-ই ভেবেছিলাম,তারপর বলেই ফেললাম বাবুদের ছাদের সেই ক্ষণিকের মুহূর্তটা। ওটাই তো আমাকে কেমন যেন বদলে দিলো! সব শুনে ডাকু হাঁ,‘দেখ ভাই, আমার মাথায় এই এতোকিছু দার্শনিক ভালোবাসা-টাসা ঢোকে না। দেখো গুরু, মেয়ে নিয়ে ঘুরবো,একটু ঘষাঘষি হবে। রাতে ঘুম ভালো হবে। আজই তো রিকাকে দেওয়ালে ঠেসে দিয়ে...’।
উফ! আবার সেই গল্প। উঠে যাওয়ার ভান করতেই ডাকু হাত ধরে টেনে বসালো।‘জানি রে ভাই। তোকে তো চিনি কিন্তু কী জানিস এতে কষ্ট ছাড়া কিস্যু পাবি না।আর এষাকে তো আমিও কমদিন দেখলাম না। বুঝতেই পারিনা।এতো খোলামেলা, হাসিখুশি। আবার ওর ঘরেই যখন বুলু ঢোকে,খুব খারাপ লাগে ওকে।’
খারাপ? লাগে? হয়তো বা কিন্তু আমার তো কখনও এমনটা হয়নি। সেটাই বা কেন? তবে কি আমি পাগল? চেতনাহীন একটা জন্তু? নাকি দুর্বোধ্য একটা ঘোর আমাকে ক্রমাগত ঘুরিয়ে মারছে? ‘জানিস, দীপঙ্করদাও জানে ব্যাপারটা। একদিন তো দেখি ঘামে চপচপে শরীর নিয়ে দীপঙ্করদা এই বটতলায় বসে। জিজ্ঞাসা করতেই বললো, ঘরে খুব গরম তাই বাইরে জিরিয়ে নিচ্ছে। আমি কিন্তু দেখেছিলাম বুলুকে তার আগে ওই ঘরে ঢুকতে’...ফস করে বিড়ি ধরায় ডাকু।
এষাদি চলে গেলো! হারিয়ে গেলো!
‘মাঠের অনেকটা ভেতরে নেমে/বেশ চেঁচিয়ে বলি শুনতে পাচ্ছ আমি একেবারে ভালো নেই।/ আমি খুব কষ্টের মধ্যে আছি,/চমকে উঠে চারদিকে তাকাই/কেউ শুনতে পেয়েছে?/ কার শুনতে পাওয়া নিয়ে ভাবনা/ তাও ভাবি’।
***************************************************
কিন্তু ভুলতে তো পারিনি। তোমাকে, এষাদি।
এক কামরার ফ্ল্যাটবাড়ির রুদ্ধঘরের টবের ফুলগাছের মতো হয়ে গেছে মনটা। কিছুতেই আর হাত বাড়িয়ে সূর্যের আলোকে পুরো আয়ত্তে আনতে পারে না। কতো জটিলতা! কতো সর্পিল হিসাবের সিঁড়ি ভাঙা ভগ্নাংশের সারি। নির্বংশ পরিবারের বাস্তুভিটের মতো আমাদের মনে এখন শুধু যেন ঘুঘু চরে। সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তারমধ্যেই সবকিছু।
তারপরেও রোজ গভীর রাতে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে আমাকে নিয়ে খুব জোরে ছুটতে থাকে গাড়ি। ড্রাইভার সুবল’দার চোখে রাশি রাশি ঘুমের বোঝা,কোনক্রমে আমাকে বাড়িতে ফেলে দিয়ে এসে আরেকটু শরীরটাকে এলিয়ে দেওয়ার নিবিড় বাসনা।
মাথা তুলে দেখি আকাশকে।‘শহরের গ্যাসের আলো ও উঁচু উঁচু মিনারের ওপরেও দেখেছি-/ নক্ষত্ররা – অজস্র বুনো হাঁসের মতো কোন সমুদ্রের দিকে উড়ে চলেছে’! আর কিছু দেখেছি কি?
তোমাকে আজও মনে পড়ে এষাদি!
