Friday, March 19, 2010

তোমাকে এষাদি

তোমাকে...এষাদি!

তোমাকে এখনও মনে পড়ে এষাদি!

বড়সড় মন্দিরে মহিলা পূজারী বা মূল পূজারীর সহকারীর ভূমিকায় কোন মহিলাকে দেখলেই আমার চোখে ভেসে ওঠে তোমার মুখসেই টানা টানা চোখের ভাসা ভাসা দৃষ্টি আজও কেমন যেন উদাস করে দিয়ে যায় একেকটা বিকেল অথবা স্তব্ধতায় ঢেকে যাওয়া শহরের রাস্তা দিয়ে খুব জোরে ছুটতে থাকা গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখতে দেখতে। কোথায় হারিয়ে গেলে?

আজও কী ভুলতে পারলাম! এষাদি, তুমি এখনও কোথা থেকে হঠাৎ করে ভেসে উঠে ফের হারিয়ে যাও ঘোর আঁধারে। বহু চেষ্টাতেও খুঁজে পাই না। হারিয়ে ফেলার সেই অব্যক্ত ব্যথা ধীরে ধীরে স্তিমিত করে দেয় ভাবনাকে। কোথায় গেলে? একটা ফাঁকা জায়গায় একবার সমুদ্রের ঢেউ আর রাশি রাশি বালি,পরের মুহূর্তেই খুব ঠাণ্ডা, বিশাল সব বরফে ঢাকা পাহাড়। এমন কোন জায়গা আছে বলে জানা নেই যেখানে একইসঙ্গে ওই বরফ ঢাকা তুষারশৃঙ্গের সঙ্গে সমুদ্রের বড় বড় ঢেউও রয়েছে। তবু তোমাকে দেখেছি সেই অপার্থিব পরিমণ্ডলেই।

*****************************************************

ভক্তিভাব আমার কোনদিনই ছিলো না, আজ নতুন করে সেই রোগ ঘাড়ে চাপারও সম্ভাবনা নেই। কী কারণে যেন কলেজে যাইনি, মাইমার জোরাজুরিতে একবার যেতে হয়েছিলো তেঘরিয়াতে লোকনাথ বাবার মন্দিরে। মাইমা খুব জোরে জোরে শানের মেঝেতে মাথা ঠুকে কী যে ক্রমাগত চেয়েই যাচ্ছিলো কে জানে! একঘেয়েমি কাটাতে কাটাতে এদিক-সেদিক তাকাতে তাকাতে চোখে পড়লো তোমাকে। পরনে টকটকে গেরুয়া শাড়ি, ফুল হাতা ব্লাউজকপালে বিশাল একটা লাল টিপ।তুমি ফুলের একটা ঝুড়ি নিয়ে সাহায্য করছিলে পুরোহিতকে।

বুকটা ধড়াস করে উঠলো। তুমিই তো? উত্তেজনা প্রশমিত করে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলাম,তুমিই! তাড়াতাড়ি উঠে যেতে যেতেই তুমি মুহূর্তে ব্যস্তসমস্ত ভাব নিয়ে চলে গেলে লাগোয়া একটা ঘরে। ওখানে বাইরের লোকের প্রবেশ নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র আশ্রমিকরাই পারেন তার ভিতরে যেতে। তাহলে তুমি এখানে?

এক লহমায় মনে পড়ে গেলো ছাড়া ছাড়া ছবিগুলো। সকালবেলায় সন্টুর দোকানের রকে বসে তিন নম্বর চা’টা শেষ করে মেজাজে ধরিয়েছি বিড়ি,হনহন করে হেঁটে এসে ডাকু পাশে বসেই ফোঁসফোঁস করে দম ফেলতে শুরু করলো।

‘কি গুরু, সক্কাল সক্কালই নিত্য’র মেয়েকে নিয়ে চরকি মারলে নাকি’?

‘ধ্যার শালা, ও মেয়ে আমাকে ছেড়ে কোথাও উড়বে না গুরু। মস্তি আছে না। আসলে সকালবেলাতেই এমন একটা খবর পেলাম যে...’।

‘কি হয়েছে রে? আবার কেউ পড়লো নাকি’? মাত্র সাতদিন আগেই সকালে কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলো বুলু। সকাল তখন সাড়ে ছ’টা হবে। শ্রীমানীপাড়ার মুখের মজে যাওয়া ডোবার সামনে রাজুর ছেলেরা খতম করে দেয় বুলুকে।প্রথমে মাথায় বোমা,তারপর বুকের ওপর বসে তিনটে গুলি! রাজু-বুলুর রেষারেষি কে না জানতো! তাই বলে ‘এলাকা আউট’ রাজু ওইভাবে বুলুকে মেরে দিয়ে যাবে,তা কেউ ভাবতেও পারেনি।

পুলিসে পুলিসে ছয়লাপ চারপাশ।সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ,কেউই কিছু দেখেনি! খাল কেটে কে,কবে কুমীর ডেকে এনেছে? এতো আবার দুই ‘অ্যান্টি-সোশালের ক্যাচাল’। এলাকা দখলের লড়াই। দেখলেই বা বলছে কে! বসে গেলো পুলিস চৌকিসকাল-বিকাল বন্দুকধারীদের কড়া চোখে হরেক সন্দেহের আনাগোনা।আমাদের সন্ধ্যার আড্ডারও দফা রফা। তবে দিনচারেক পরে আবার যে কে সেই! পুলিস ফিরে গেলো তার জায়গায়,লোকে বুলুর স্মৃতি ভুলতে ভুলতে ব্যস্ত হয়ে গেলো ব্যক্তিগত আশা-নিরাশার জাল ছাড়ানোয়। তাহলে আজ সকালে কী এমন হলো?

‘জানিস, এষা চলে গেছে’!

ছোট্ট একটা কথা,অথচ কী ভয়ঙ্কর! গোটা শরীরটাই যেন মুহূর্তের জন্য দুলে গেলো! কি বলছে? বিড়িটা ধরিয়ে নিয়ে একটা হাল্কা টান দিয়ে ডাকু বলতে লাগলো,‘জানতাম এমনটাই হবে। শালা ওই মেয়ে’কে ধরে রাখা খুব কঠিন। বুলুও তো যেতো ওর কাছে...’। কথাগুলো আর কানে ঢুকছে না। শুধু দেখতে পাচ্ছি ডাকুর ঠোঁটটা নড়েই চলেছে কিন্তু আওয়াজটা দুর্বোধ্য ঠেকছে।

ভাসছে কিছু আবছা দৃশ্য। মিষ্টি হাসি। সন্ধ্যা হলেই এষাদির ঘর থেকে ব্যাডমিন্টনের নেট, আলো, র‌্যাকেট বের করে আনার ব্যস্ততা। কাজটা যতো আস্তে করা যায়, আরেকটু দেখা যায়। আলো-টালো লাগিয়ে একবার চা,সেটাও এষাদির হাতে তৈরি। দীপঙ্করদা হাফ প্যান্ট আর সাদা রঙের একটা গেঞ্জি পরে বেরিয়ে আসতো।পায়ে ধবধবে সাদা কেডস। দুটো ম্যাচ খেলেই দীপঙ্করদা পাশেই ক্লাবে বসে যেতো ব্রিজের জমাটি আসরে,আমি আর ডাকু জানলার ধারে গিয়ে এষাদিকে ডেকে চেয়ে নিতাম দেশলাই।‘তোরা বিড়ি ফুঁকিস আর দেশলাই রাখতে পারিস না’,কেমন যেন একটা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের সুর ছিলো সেখানে। তাহলে তুমিই বা রোজ রোজ তা যোগান দাও কেন?

আবার তেমনই এক সন্ধ্যায় এষাদির ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলাম বুলুকে। শুনেছিলাম,দেখলাম সেদিন। গায়ের জামাটা খুলে কাঁধের ওপর রাখা,মুখে জ্বলন্ত সিগারেট। দরজার সামনে এষাদির কোমরে আলতো হাত বুলাতে বুলাতে হাসছে বুলু। এষাদির মুখেও ছিলো হাসির রেশদুঃখের? প্রাপ্তির? যন্ত্রণার? আমাদের আসতে দেখে বুলু বলে উঠলো,‘ওই যে এলো সব বড় খেলুড়ে! পয়সা পাস কোথা থেকে যে এতো বড়লোকের খেলায় মেতেছিস’? চুপ করে রয়েছি। ডাকুটা ঠোঁটকাটা। বলে ফেললো,‘দাও না বস কিছু টাকা। শাটলগুলোর খুব দাম’। অবজ্ঞা ভরে দুটো একশো টাকার নোট ডাকুর হাতে গুঁজে দিয়ে বুলু বেরিয়ে গেলো। এষাদিও তাড়া দিলো,‘নে, বের করে নে। আমি আবার একটু স্নানে যাবো’।

এও তো দেখেছি,কিন্তু কোনকিছুই স্পর্শ করতে পারতো না আমার ভাবনাকে। শুনেছিলাম, বুলুর সঙ্গে এমনই সম্পর্কের কথা যেদিন জেনেছিলো দীপঙ্করদা,সপাটে নাকি থাপ্পড় লাগিয়েছিলো এষাদিকে। সেও শোনা ডাকুর থেকে। সত্যি না মিথ্যে তা নিয়ে যাচাই করতে প্রবৃত্তি জাগেনি। এমনটা তো অতি স্বাভাবিক। হয়তো আরো নাটকীয় কিছু হতে পারতো! তবে সেইসব হরেক সমস্যা আমার ভালো লাগায় ব্যাঘাত ঘটাতে দেয়নি। আসলে হবেই বা কিভাবে? বারবার করে বৃষ্টিস্নাত সেই শেষ বিকালে মিষ্টি হাসির কলরোল মাথার মধ্যে তুলে দিতো হিল্লোল!

‘...দীপঙ্করদাকে দেখলাম চুপচাপ বসে রয়েছে। শালা এ-ই হয়!’ডাকু তখনও বকেই চলেছে।

তাহলে সেই এষাদি এখানে! কেমন যেন একটা উজ্জ্বল আভা বেরিয়ে আসছিলো শরীর থেকে। সৌন্দর্য যেন আরো এক উচ্ছ্বলতা নিয়ে ঘিরে ফেলেছে এষাদি’কে। তবে কি আমাকে চিনে ফেলেই ইচ্ছা করে ঢুকে গেলো ভিতরে? হতে পারে! তবে এতোদিন বাদে আমার মুখ কি মনে থাকবে? দাঁড়িয়ে রয়েছি। আরেকবার কি বেরবে না এষাদি?

শানের মেঝেতে বিস্তর কপাল ঠুকে তখনই মাইমা এসে হাইমাই শুরু করে দিয়েছে,‘চল,এবার তো যেতে হবে। বাব্বাঃ, কম দূর! মনটা খুব ভালো হয়ে গেলো’। মাথায় তখন আমার আগুন জ্বলছে, হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির মুখ খুলে বেরিয়ে আসছে কাঁড়ি কাঁড়ি ঘটনা। মনে মনে মাইমারই বাপান্ত করতে করতে ফিরে এলাম।ছবিটা রয়েই গেলো!

*******************************************************

দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে চব্বিশটা বছর। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে তখন রীতিমতো লায়েক। বিড়ি-সিগারেটে হাতেখড়ি হয়ে গেছিলো মাধ্যমিকের আগেই। উচ্চ মাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে একদিন উঠেছি বাবুদের ছাদে। পকেট থেকে একটা ক্লাসিক সিগারেটের প্যাকেট বের করে বাবু আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বললো,‘টান’! টান মানে? নতুন করে টানার কি আছে? এট অস্বীকার করার উপায় নেই, সিগারেট টানতে তখন তো হাঁটতে হতো প্রায় মাইল খানেক! সঙ্গে আবার মৌরি,লজেন্স কতো কী! মামা আবার মুখে তামাকের গন্ধ পেলে চামড়া তুলতে এক সেকেন্ডও সময় নেবে না।

তাছাড়া বাবুদের ছাদ থেকে আমার মামাবাড়ির ছাদ দেখা যায় স্পষ্ট। মামাতো দাদা তখন নিয়মিত উল্টোদিকের বাড়ির মিত্রাদি’র সঙ্গে ‘দিল্লাগি’ করছে। আদর করে নাম দিয়েছিলো ‘জুলিয়েট’! কয়েকবার ‘খবরি’ হয়ে দিয়েও এসেছি গোপন চিঠি,সঙ্গে দাদার শিখিয়ে দেওয়া বুলি,‘ঘোষপাড়ার ইলেকট্রিক সাপ্লাই অফিসের গলিতে ঠিক সাড়ে পাঁচটা’!

এই রোমাঞ্চকর চিঠি চালাচালিতে আমার ‘ডাকহরকরা’ বনে যাওয়া ঠিক কতোটা যুক্তিযুক্ত ছিলো, সেটা অবশ্যই একটা জোরালো প্রশ্ন,তবে ক্লাস সেভেন থেকে খবরের কাগজে হরেক সিনেমা এবং তার নায়ক-নায়িকার নাম মুখস্ত করে ফেলা আর গরমের দিনে বিকালে ফুটবল পিটিয়ে সন্ধ্যাবেলায় রিঙ্কাদের পাতকুয়োতলায় গুজরাটি বৌদির গা ধুয়ে শাড়ি মেলার মুহূর্তটা লুকিয়ে না দেখতে পারলে যেন দিনটাই বৃথা গেলো! লুকিয়ে ‘হলুদ বই’ পড়ে শরীরে সে কী অস্বস্তি!

তো সেদিন বাবু ছাদে নিয়ে গিয়ে আসলে হাতে খড়ি দিতে চাইছিলো গঞ্জিকা সেবনের। সিগারেটের তামাক বের করে সেখানে গাঁজা ভরে কষে টান। এক টানেই মাথা হাল্কা!‘শালা, এরজন্য ছাদে নিয়ে এলি’,রাগে আমার মাথায় যেন আগুন জ্বলছে। শেষমেশ কীনা গাঁজা! কিছুতেই টানবো না, আর বাবুও ছাড়বে না। ‘ধ্যুর একবার টেনেই দেখ না। ভালো না লাগলে কে তোকে মাথার দিব্যি দিয়েছে’,বাবু প্রায় ঘাড়ের ওপর চেপেই বসলো। প্রচুর ধস্তাধস্তি করেও শেষমেশ হার মানতে হলো বাবুর কাছে। কষে একটা টান দিয়েই গোটা পৃথিবী অন্ধকার। চারপাশ ঘুরছে বনবন করে, চোখে সব ঠেকছে ধোঁয়ার মতো,মাথার মধ্যে যেন পাথর ভাঙছে কেউ। আমি তো পাগলের মতো বাবুকে খুঁজছি,হাতের কাছে একবার পেলে শালার যদি নাক না ফাটিয়ে দিই তো এক বাপের বেটা নই!

আমার ওই দশা দেখে বাবু ছাদের ট্যাঙ্ক থেকে মগে করে জল এনে আমার চোখেমুখে ছিটোতে শুরু করেছেএকটু সুস্থ হয়ে যখন সবকিছু ধীরে ধীরে ফিরছে আগের অবস্থায়,বাবু তখন পালটা ধমকাচ্ছে ,‘তোকে ওইভাবে কোঁৎ করে গোটা ধোঁয়া কে গিলতে বললো! এই দেখ আস্তে আস্তে টানতে হয়’। আমারই ফেলে দেওয়া গাঁজা ভরা সিগারেটটা কায়দা করে টেনে দেখাতে লাগলো ধোঁয়া গেলার কায়দা। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে আমি তখন খুঁজছি শক্ত লাঠিগোছের একটা কিছু...। ঠিক সময়েই হাজির এষাদি। বর্ষার শেষ বিকেলে যে অদ্ভুত একটা দুখী আলোয় ছেয়ে যায় গোটা আকাশ, রাজকন্যা এলো ভরা শ্রাবণের প্লাবনের মতো। একবার তাকিয়েই সব শেষ! বাবুদের ছাদের একেবারে গা ঘেঁসে বেণুদার বাড়ির ছাদে সেই শেষ আলোর আকাশে উচ্ছ্বলতা ছড়িয়ে দিয়ে এষাদির হাসির শব্দই গুলিয়ে দিলো সবকিছু।

-‘কি রে বাবু,ওকে সিগারেট না খাওয়ালেই নয়’। একমুঠো ঝলমলে হাসি ছুঁড়ে দিয়ে এষাদির ওই কথাটাই যেন আমাকে রাতারাতি তাতিয়ে দিলো।

-‘না, না। ও জোর করেনি,’ বলতে বলতে বাবুর হাত থেকে সিগারেটটা প্রায় কেড়ে নিয়ে আমি এবার টান দিলাম অতি সাবধানে,তারপর খুব আস্তে আস্তে ধোঁয়াটা টেনে নিলাম ভিতরে। মাথাটা আবারও চলকে গেলেও বুঝতে দিলাম না কিছু। তাহলে তো হেরে যাবো! কার কাছে? আজ ভাবতে গেলে নানান যুক্তি এসে আমাকেই তামাসার আইটেম বানিয়ে ফেলে, কিন্তু সেদিন ওই বৃষ্টিতে ক্লান্ত বিকালে এষাদিই আমাকে ফেলে দিলো নিজের সঙ্গে কঠিন এক যুদ্ধে। হারতে পারবো না। কিছুতেই না। একটু এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে এষাদি নেমে গেলো নিচে। গলা শুকিয়ে কাঠ,চোখদুটো যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু ওই ক্ষণিকের ঝিলিমিলি হাসির তরঙ্গে আমি হয়ে গেলাম নিঃস্ব!

ওই যে বলছিলাম, উচ্চ মাধ্যমিক দিয়েই রীতিমতো লায়েক। পাড়াতে খুব একটা সুনাম কোনদিনই ছিলো না। মুনমুনদের বাড়ির রকে বসে বিড়ি টানতে টানতে খিস্তির নিয়মিত অনুশীলন, বেলা সোয়া দশটা থেকে পৌনে এগারোটা পর্যন্ত রাজকুমারী আর মায়াপীঠের ডে-স্কুলের মেয়েদের উৎসাহ প্রদানআবার কখনও কোন বন্ধুর ভাদ্র মাসের পচা গরমে পেকে যাওয়া খাজা আমের মতো গলে পড়া প্রেমকে ভরসা দিতে কোন মেয়ের চলন্ত রিক্সায় ছুঁড়ে দেওয়া চিরকুট।সঙ্গে চাপা গলায় নির্দেশ,‘জবাবটা যেন ঠিক সময়ে আসে’! আমাদের রাজুর তো আবার যে কোন মেয়েকে দেখলেই প্রেম পেয়ে বসতো! সে এক মহা ঝামেলা। বাবুলাল একদিন বলে ফেললো,‘শালাটাকে পাটবাড়িতে নিয়ে চল,চারপাশে ঠাকুমা-দিদিমারা থাকবে।সব প্রেম পিছন দিয়ে বেরিয়ে যাবে!’ কিন্তু কোন কারণে এষাদি সেখান দিয়ে একবার হেঁটে গেলেই আমার সব তালগোল পাকিয়ে একাকার।

ঘড়ির কাঁটা দশটা, এগারোটা পেরিয়ে বারোটা-সাড়ে বারোটা। বন্ধুরা যে যার খোপে ঢুকে গেছে, বারান্দা থেকে মাইমা অন্তত বার পাঁচেক হাঁক দিয়ে ফিরতে বলেছে।প্রতিবারই হাত নেড়ে বলি,‘আসছি’,কিন্তু পা আর সরতে চায় না। গেলো তো পোস্টাবিসের দিকে, ফিরতে এতো সময়ই বা লাগবে কেন? তাহলে কি ফিরে গেছে, দেখতে পেলাম না। তাই বা হয় কী করে? একবারও তো জায়গা ছেড়ে নড়িনি, চোখ ছিলো সামনের দিকে। তাহলে হয়তো অন্য কোথাও...। কীরকম যেন একটা ব্যথা নিয়ে ফিরে আসা। কোনক্রমে মাথায় জল ঢেলে ভাত খেয়ে বিকালের অপেক্ষায় এপাশ-ওপাশ করা।

ঠিকানাটা জেনে গেছিলাম। জেনে গেলাম ডাকুর থেকে।

‘কি ভাই, ফেঁসেছো নাকি’! ডাকু বরাবরই এমন।

‘ধ্যুর শালা! তোর খালি ওই এক কথা। আসলে সেদিনই দেখলাম’,আমি সতর্ক।

‘গুরু আমাদের পাড়াতেই থাকে। ওই তো লালুর দিদির একতলায় ভাড়া থাকে। তবে ভাই কপাল ফাটা, তোর নাম্বার লাগবে না’।ডাকু যথারীতি বেখাপ্পা

জেনে গেলাম পুরো ঠিকানা। শ্রীমানী পাড়ায় বটতলার ধারে সুন্দর দোতলা বাড়িটা লালুর দিদির।তবে লালু বা লালুর দিদির থেকেও পাড়ায় অনেক বেশি পরিচিত বুলু। ক্লাস এইটেই প্রথম মার্ডার ইঁট ভাটার মালিককে, নিজের হাতে। তারপর জেল খেটে বাইরে এসে বুলু রীতিমতো ত্রাস।‘হপ্তা’ তোলা থেকে শুরু করে নির্লিপ্ত হয়ে মানুষ মারা যেন জলভাত বুলুর কাছে। সেই বুলুর দিদির বাড়িতে ভাড়াটে! শুনেই কেমন যেন মনটা ভারি হয়ে গেলো। আর কোন বাড়ি মিললো না! ডাকু তখনও বলে চলেছে,‘আরে ওই যে দীপঙ্করদা আমাদের সঙ্গে রাতে ব্যাডমিন্টন খেলতে আসে না, ওরই তো বৌ। গুরু খাসা মাল’!

দীপঙ্করদা আমারও অতি পরিচিত। প্রতিদিন সকালে রোজ সাড়ে আটটার সময় ব্যস্তসমস্ত হয়ে দীপঙ্করদার গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরিতে দৌড়ানোর ছবি অতি পরিচিত। আমরা তো ঘড়ি না দেখেই ‘টাইম’ বলে দিতে পারতাম শুধু দীপঙ্করদার দৌড় দেখেই। সে যাই হোক, আমার তো কোন রেষারেষি নেই কারোর সঙ্গে। একবার একটু দেখতে পেলেই হলো!

বিকাল হলেই নিয়মিত ঠেক বসে গেলো বটতলার ভাঙাচোরা রকে। কয়েকটা ইঁট-পাথর জোগাড় করে তৈরি হয়ে গেলো বসার জায়গা। সন্ধে নেমেছি কি নামেনি, নিত্যবাবুর মেয়ে রিকা পড়তে যাওয়ার নাম করে একটা চক্কর কেটে আসতো বসাক বাগানের মাঠের ধারে গোয়ালের পিছনে। ডাকু ওখানেই দাঁড়িয়েফিরতে ফিরতে সেই সাড়ে সাতটা। ‘বুঝলি আজ যা দিলাম না...। কি রে, দেখা হলো’? ডাকুর প্রায় প্রতিদিনের সেই পরিচিত প্রশ্নগুলো যে বিরক্ত করতো না তা নয়, আবার এও ভাবতাম বন্ধু তো। কাকেই বা বলবে!

‘আচ্ছা অপু, তোর কেসটা কী বল তো? এভাবে তো পাগলা হয়ে যাবি? তুই শালা নিশ্চিত ফেঁসেছিস’,ডাকু বলে উঠলো।

‘না রে ভাই। আদৌ তেমনটা নয়’। বলবো না-ই ভেবেছিলাম,তারপর বলেই ফেললাম বাবুদের ছাদের সেই ক্ষণিকের মুহূর্তটা। ওটাই তো আমাকে কেমন যেন বদলে দিলো! সব শুনে ডাকু হাঁ,‘দেখ ভাই, আমার মাথায় এই এতোকিছু দার্শনিক ভালোবাসা-টাসা ঢোকে না। দেখো গুরু, মেয়ে নিয়ে ঘুরবো,একটু ঘষাঘষি হবে। রাতে ঘুম ভালো হবে। আজই তো রিকাকে দেওয়ালে ঠেসে দিয়ে...’।

উফ! আবার সেই গল্প। উঠে যাওয়ার ভান করতেই ডাকু হাত ধরে টেনে বসালো।‘জানি রে ভাই। তোকে তো চিনি কিন্তু কী জানিস এতে কষ্ট ছাড়া কিস্যু পাবি না।আর এষাকে তো আমিও কমদিন দেখলাম না। বুঝতেই পারিনা।এতো খোলামেলা, হাসিখুশি। আবার ওর ঘরেই যখন বুলু ঢোকে,খুব খারাপ লাগে ওকে।’

খারাপ? লাগে? হয়তো বা কিন্তু আমার তো কখনও এমনটা হয়নি। সেটাই বা কেন? তবে কি আমি পাগল? চেতনাহীন একটা জন্তু? নাকি দুর্বোধ্য একটা ঘোর আমাকে ক্রমাগত ঘুরিয়ে মারছে? ‘জানিস, দীপঙ্করদাও জানে ব্যাপারটা। একদিন তো দেখি ঘামে চপচপে শরীর নিয়ে দীপঙ্করদা এই বটতলায় বসে। জিজ্ঞাসা করতেই বললো, ঘরে খুব গরম তাই বাইরে জিরিয়ে নিচ্ছে। আমি কিন্তু দেখেছিলাম বুলুকে তার আগে ওই ঘরে ঢুকতে’...ফস করে বিড়ি ধরায় ডাকু।

এষাদি চলে গেলো! হারিয়ে গেলো!

‘মাঠের অনেকটা ভেতরে নেমে/বেশ চেঁচিয়ে বলি শুনতে পাচ্ছ আমি একেবারে ভালো নেই।/ আমি খুব কষ্টের মধ্যে আছি,/চমকে উঠে চারদিকে তাকাই/কেউ শুনতে পেয়েছে?/ কার শুনতে পাওয়া নিয়ে ভাবনা/ তাও ভাবি’।

***************************************************

কিন্তু ভুলতে তো পারিনি তোমাকে, এষাদি।

এক কামরার ফ্ল্যাটবাড়ির রুদ্ধঘরের টবের ফুলগাছের মতো হয়ে গেছে মনটা। কিছুতেই আর হাত বাড়িয়ে সূর্যের আলোকে পুরো আয়ত্তে আনতে পারে না। কতো জটিলতা! কতো সর্পিল হিসাবের সিঁড়ি ভাঙা ভগ্নাংশের সারি। নির্বংশ পরিবারের বাস্তুভিটের মতো আমাদের মনে এখন শুধু যেন ঘুঘু চরে। সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তারমধ্যেই সবকিছু।

তারপরেও রোজ গভীর রাতে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে আমাকে নিয়ে খুব জোরে ছুটতে থাকে গাড়ি। ড্রাইভার সুবল’দার চোখে রাশি রাশি ঘুমের বোঝা,কোনক্রমে আমাকে বাড়িতে ফেলে দিয়ে এসে আরেকটু শরীরটাকে এলিয়ে দেওয়ার নিবিড় বাসনা।

মাথা তুলে দেখি আকাশকে।‘শহরের গ্যাসের আলো ও উঁচু উঁচু মিনারের ওপরেও দেখেছি-/ নক্ষত্ররা – অজস্র বুনো হাঁসের মতো কোন সমুদ্রের দিকে উড়ে চলেছে’! আর কিছু দেখেছি কি?

তোমাকে আজও মনে পড়ে এষাদি!

Saturday, March 13, 2010

ফাস্টার, হায়ার, স্ট্রঙ্গার
কাহিনির শুরু বলিউড থেকে।
চাক দে ইন্ডিয়া। এক বিতর্কিত হকি ব্যক্তিত্বের নিজের সঙ্গে লড়াই করার পাশাপাশি ভারতীয় মহিলা হকি দলকে নিয়ে স্বপ্নের মিনারে চেপে বসার গরমাগরম, সুপারহিট ছবি। কতোটা তারমধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে বাস্তবতার ছোঁয়া অথবা সেলুলয়েডের অতি সহজ-সরল সমাধানের সূত্র ধরে নিজের জীবনকে মেলাতে গিয়ে কোথায়, কী সুবিধার মুখ দেখা গেছে তা নিয়ে তর্কটা এখন থাক। মূল বিষয়টা অন্য জায়গায়। রাজ্যসভায় ঐতিহাসিক মহিলা সংরক্ষণ বিল পাস হয়ে যাওয়ার পরেও প্রশ্ন থাকছেই। মহিলাদের যথাযথ অবস্থান ঠিক এখনও কোন পর্বে রয়েছে?
কবীর খান থেকে শুরু করে বিদ্যা শর্মা, বলবীর কাউর অথবা কোমল চৌতালা বা সোইমুই কেরকেটা। নামগুলো এখনও ভুলে গিয়েও ভোলা যাচ্ছে না। ভোলা সম্ভবও হয় না। জনপ্রিয় ছবিতে ভেসে ওঠা সেই খানিকটা নিজেরই অপূর্ণ, অবদমিত ভাবনাগুলো যখন এমনই কিছু নামের মধ্যে ফুটে ওঠে, মাথার ভেতরটা কেমন যেন ঝনঝন করে। হরেক ব্যস্ততার ফাঁকেও নামগুলো রয়েই যায় অতি সঙ্গোপনে। কিন্তু তারপর!
তাহলে দেখা যাক অন্য মেরুতে দাঁড়িয়ে। অঞ্জুম চোপড়া, দোলা ব্যানার্জি, ঝুলন গোস্বামী, মৌমা দাশ, মেরি কোম, নেহা আগরওয়াল অথবা গীতু আন্না। বাজি রেখে বলে ফেলা যায় প্রথম তিন-চারটে নাম অতি পরিচিত হওয়ার পরেই কেমন যেন পরীক্ষার হলে বসে আনসিন কোয়েশ্চেনদেখার মতো দুর্বোধ্য। হয়তো আন্দাজ করাই যায় কিছু একটা বিশেষ ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে এইসব নামের সঙ্গে, তবে তো ফের প্রশ্ন জাগে প্রতিদিনের আলোচনায় সেই নামগুলো কেন মুখ্য বিবেচ্যে পরিণত হতে পারে না। পুরোদস্তুর নিরপেক্ষতা নিয়েই এটুকু তো বলাই যায়, ভারতীয় খেলাধুলার জগতে যতোরকম হুলুস্থুল কাণ্ডকারখানা ঘটে চলে অহরহ এবং তা নিয়ে আম পাবলিকেরও রয়েছে বিবিধ অভিমত সেক্ষেত্রে সাম্য ব্যাপার তো থাকবেই। কিন্তু আছে কি?
খোলাবাজারি অর্থনীতির রমরমা এবং তার প্রকোপে বাকি সবকিছুকেই খুল্লমখুল্লা করে ফেলার তীব্র ইঁদুর দৌড়ই ঘুম থেকে খবরের কাগজে চোখ রেখে সেরা আইটেমে পরিণত হয়েছে। তাহলে এই মেয়েগুলোর খামতি কোথায় যে ছোট্ট একটা জায়গাও বানিয়ে ফেলতে পারে না! তাদের নিয়ে নেই কোন প্রচার, নেই বিজ্ঞাপনদাতাদের হুড়োহুড়ি, নেই বাজারী রেষারেষি।এও আবার একটা কথা হলো নাকি!
কথা যেমনই হোক, বাস্তবে চোখ রাখলে অতি বড় সমালোচকও স্বীকার করতে বাধ্য, গত এক দশকে ভারতীয় খেলাধুলার জগতে মহিলাদের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এগিয়ে আসার প্রয়াস জারি রয়েছে। বলা যেতে পারে সেখানে বাহুল্য নেই, নেই ক্যামেরার লেন্সের সতর্ক দৃষ্টি। তাহলেও গতি রয়েছে। এইমুহূর্তে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল আই সি সি র‌্যাঙ্কিংয়ের তিন নম্বরে। বাস্কেটবলে গীতু আন্নাকে নিয়ে খোদ মার্কিন মুলুকের উওমেন বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন পর্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। সেই তুলনায় ২০০২ কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয়ের পর থেকে এযাবৎ ভারতীয় মহিলা হকি দল নতুনভাবে দাগ কাটতে পারেনি কিন্তু লড়াই রয়েছে জারি। তাই বলে দোলা ব্যানার্জি বা মেরি কোমের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা হচ্ছে না খাটো।মজার ব্যাপার, এতোসমস্ত উদাহরণ খাড়া করেও মূল জায়গায় পৌঁছেই গুলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। এদের জন্য কেউ নেই। নেই সহায়তার ভাবনা। কেন?
এইমুহূর্তে যে সমস্ত বহুজাতিক সংস্থার বদান্যতায় এগিয়ে চলেছেন সফল পুরুষ ক্রীড়াবিদরা,সেই বিপুল বিনিয়োগ থমকে দাঁড়াচ্ছে মহিলাদের আঙিনায় পা রেখেই। শুনতে হয়তো খারাপই লাগে কিন্তু টেনিস বাদ দিয়ে সানিয়া মীর্জার আনুষঙ্গিক ভাবভঙ্গী বিজ্ঞাপনদাতাদের বাজার ধরার কাজ ঠিক যতোখানি সহজ করে দেয়, বাকিদের ক্ষেত্রে তা কিছুতেই মেলার নয়। ফলে একশো শতাংশ স্পোর্টস রোল মডেলহয়েও দোলা অথবা ঝুলনরা কিছুতেই মন ভেজাতে পারছেন না বিজ্ঞাপন জগতের কর্তাব্যক্তিদের। বেঙ্গালুরুর নামজাদা সংস্থা গো স্পোর্টসসংস্থার আধিকারিক নন্দন কামাথ যাকে ব্যাখ্যা করছেন,‘হিরো ওয়ারশিপ বলে যে কথাটা খুব প্রচলিত এই বিজ্ঞাপনী মহলে সেখানে সানিয়াকে ছেড়ে দ্বিতীয় কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বা পাওয়া গেলেও ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করার ইচ্ছা নেই কারোর।ওখানে আরো কিছু ফ্যাক্টর দরকার’!
২০০৮ বেজিং ওলিম্পিকে ভারতের একমাত্র বাইচ প্রতিনিধি হিসাবে হাজির ছিলেন নেহা আগরওয়াল।নেহা যেমন কিছু করে দেখাতে পারেননি, তেমনই তাঁকে নিয়ে ফেডারেশনেরও ছিলো না কোনরকম পরিকল্পনা যাকে সম্বল করে পরবর্তীতে কিছু করার সুযোগ থাকে। বাণিজ্যিক দুনিয়াতে কলকে পেতে হলে আরো অনেককিছুর সঙ্গে ভালোমতো ইংরাজি বলাও যে খুব দরকারী তা নিয়ে কারোরই মাথা ব্যথা ছিলো না, নেইও। অন্তত নেহা নিজেই তা অনুভব করেছেন,‘প্রথমত দৃষ্টিভঙ্গিই একমুখী, তারপরেও যে সুযোগ ছিলো সেই আমাদের মতো প্রতিনিধিদের এগিয়ে যাওয়ার পথে যেরকম পেশাদারিত্বের শিক্ষার প্রয়োজন ছিলো তা পূরণ হয়নি, কেউ তা নিয়ে ভাবতেও চাননি। ফলে সাফল্য থাকলেও তার কোন মূল্য থাকে না প্রচারের দুনিয়াতে।
কমবেশি একই অভিজ্ঞতা গীতু আন্নার। মাত্র ২৪ বছর বয়সেই গীতু প্রথম ভারতীয় হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার ক্লাবে বাস্কেটবল খেলে এসেছেন। তিনিও জানাচ্ছেন, পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যেভাবে লিঙ্গ নির্ধারণে না বসে সেরা সফল মুখগুলিকে সবদিক থেকেই তৈরি করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং কর্মপদ্ধতি রয়েছে তা ভারতের বুকে ভাবাই যায় না। কিন্তু তবু যাঁরা সেই প্রতিবন্ধকতাকে দূরে সরিয়েই ব্যক্তিগত দক্ষতার শীর্ষে থেকেই এগিয়ে চলেছেন তাঁদেরকে নিয়েও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির হেলদোল নেই। ফলে যেচে কোন্‌ বিজ্ঞাপনদাতাই বা এসে হাজির হবে!
আসলে ঝামেলাটা পাকিয়েছে অন্যত্র। খুব ভালোভাবে বাজার যাচাই করে ধরা পড়ছে, যে পরিমাণ বিজ্ঞাপনী বিনিয়োগ পেতে পারতেন গীতু অথবা নেহা, তার সিংহভাগ চলে গেছে বলিউডের চটুল নায়িকামহলে এবং বাদবাকি অংশ টেলিভিসনের সুদীর্ঘ সোপ অপেরারকুশীলবদের আরো জনপ্রিয় করার কাজে।ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস গ্রুপের দক্ষিণ এশীয় বিভাগের অধিকর্তা রিশ কৃষ্ণমাচার বলছেন,‘সচরাচর খেলাধুলার জগতে দুটো আবেদনে আমাদের বেশি নজর থাকে। একটা যদি মাঠে পারফরম্যান্সের উৎকর্ষতা হয়ে থাকে, পাশাপাশি দেখে নিতে হয় টেলিভিসনের সামনে হাঁ করে বসে থাকা এক বিশাল সংখ্যার মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কতোটা থাকছে। সেখানে বারবার করে যুবরাজ বা শচীনের চাহিদা যে উত্তরণের দিশা দিচ্ছে বিনিয়োগকারীদের, সেখান থেকে মুখ অন্যদিকে ঘোরার তাগিদই অনুভূত হচ্ছে না। বলতে পারেন, বাজার ধরার কারণেই মহিলাদেরও যেভাবে তুলে আনার দরকার ছিলো সেটাও গেছে হারিয়ে নিতান্তই অনিচ্ছার কারণে। অর্থাৎ ঘুরে ফিরে সেই...!
তাহলে? না, এমন কোন প্রশ্ন তোলাই অসঙ্গত এখানে। আই পি এলর ভরা বাজার, বলিউডের বাছাই করা নায়ক-নায়িকার দলের হাতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা এবং সেই টাকাকে অন্য পথে খাটিয়ে আরো বিত্তশালী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় যে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে গ্ল্যামার দুনিয়া’,সেখানে কুৎসিত, কালো রঙের চোখমুখ অথবা নিয়মিত হরেক বাধার সঙ্গে যুঝতে যুঝতে তোবড়ানো গালের মেরি কোমের জায়গাই হচ্ছে না সামনে আসার। এবং খুব তাড়াতাড়ি সেই সুযোগও যাবে জুটে তারও কোন লক্ষণ নেই।
কোন্‌ বিজ্ঞাপনে যেন রোজ দেখানো হয়,‘ফাস্টার, হায়ার অ্যান্ড স্ট্রঙ্গার। গাছের ডাল ধরে যে মিষ্টি মুখটা দোল খায় আর মায়ের হাতে সুস্বাদু পানীয়র লোভে এক ছুটে হারিয়ে দেয় ভাইকেও। টেলিভিসনের সামনে বসে কেমন যেন একটা অলীক চিন্তায় ভরে ওঠে মন। তারপর চলে আসে আরেকটা বিজ্ঞাপন। বোঝা যায়, ব্যাপার যাই হোক, ওদের জন্য খাটে না এই শর্তগুলো! যত্তো সব ভাঙা মুখের দল!

Monday, March 8, 2010

আজ দিনটা মেয়েদের!

প্রতিদিনই ঘুম ভাঙে দেরিতে।

আগে শুলেও যা, শেষ রাতে শুতে গেলেও একই চেহারা।

ঘুম ভাঙে প্রতিদিন রেডিওর গাঁকগাঁক করা শব্দে। আমাদের ঘরের রেডিওটা আবার বেয়াড়া ধরণের। কখনও অ্যায়সা জোরে হাঁক দিয়ে ওঠে, পাশের বাড়ির লোকেও চমকে উঠতে বাধ্য। পরমুহূর্তেই আবার শব্ট টব্দ কোথায় হাওয়া। অতি ক্ষীণ এক শব্দতরঙ্গে ভেসে আসে। অতি কষ্টে কান পেতে তা শুনতে শুনতে কখনও সখনও মনে পড়ে যায় মাধ্যমিকে পড়া পদার্থবিজ্ঞানের শব্দ চ্যাপ্টার। মনুষ্যেতর প্রাণীদের কান খুব সহজ, অতি দূরবর্তী শব্দও ভেসে আসে তাদের কর্ণপটহে।

ফিক করে নিজের মনেই তখন হেসে মনে মনে বলে ফেলি,‘শালা, জীবনে কিছুটা সময় কুকুর হয়ে থাকাও খুব জরুরী ছিলো!’ খুব কষ্ট করে চোখটা সামান্য একটু ফাঁক করে জানলা দিয়ে গায়ের ওপর পড়া নরম রোদের ছোঁয়া নিতে নিতে বিড়বিড় করি,‘বাব্বা! এই হলো গিয়ে শব্দব্রক্ষ্ম’! রামপ্রসাদী দিয়ে শুরু হয়ে শাম্মি কাপুর ঘুরে সাড়ে সাতটায় গানের কলি ঢুকে পড়ে আমীর-শাহরুখে। মাঝে ‘ফিল ইন দ্য ব্ল্যাঙ্কসের’ মতো টলিউডি ঝঙ্কার। চলে পাল্লা দিয়ে ‘আজকের সকালে, কী আছে কপালে’! আমি তো শুধু মন দিয়ে শুনি ‘মেষ’ রাশি কী বলছে। এই চল্লিশে পা রেখে তো সার বুঝেছি নিজের থেকে এতো ভালো এবং উন্নত ‘মেষ’ দ্বিতীয় একটিও নেই!

ঘুম আজও ভাঙলো। ভাগ্যিস ছেলের পরীক্ষাটা শেষ হয়েছে, তাই খানিকটা স্বস্তিতে পাশ ফিরে শোয়ার সুযোগ মিলেছে বিচিত্র সুরতরঙ্গে হাবুডুবু খেতে খেতেই কানে ভেসে এলো,‘আজ বিশ্ব নারী দিবস। তামাম মহিলাকে জানাই সেলাম’! অন্যদিন যাও বা একটু জোরে রুমাকে হাঁক দিয়ে ডেকে চায়ের কথা বলি। আজ হাঁক দিতে গিয়েও চুপ করে গেলাম। আজ বিশ্ব নারী দিবস। নিজেকে চাপা গলায় বলে ফেললাম,‘ চেপে যাও গুরু, দিনটা আজ অন্য !

আমার পাঁচ বছরের বিচ্ছু ছেলে রিকুকে দেখভালের জন্য রয়েছে কাজের মেয়ে। দিন প্রতি পঞ্চাশ টাকা, না এলে টাকা নেই। কতোটা কী করতে পারবে তা ঠিক হওয়ার আগেই মুখে মুখে পাকা হয়ে যায় চুক্তি।দেখো, পরে আবার এসব নিয়ে ঝামেলা করো না। সারাদিন যে খাটাখাটনি যায়,ওসব শুনতে আর ভালো লাগে নাবারবার করে ওই কথাটা রুমার মুখে শুনতে শুনতে আমারও মুখস্থ হয়ে গেছে। থুড়ি! আমার ছেলেও কণ্ঠস্থ করে ফেলেছে!

দত্তাবাদের এঁদো বস্তি থেকে রোজ দশটায় নিঃশব্দে বাড়িতে ঢুকে শুক্লা সোজা চলে যায় পিছনের বাগানের কলে পা-হাত ধুতে। কাজের লোকের স্ট্যাটাসই আলাদা। মানে মুখে যা বলছি, মন থেকে তাকে মানার কোন প্রশ্নই ওঠে না। ফলে স্পষ্ট একটা ব্যবধানরেখা টেনে দিয়েই ওই ঝামেলা মিটিয়ে ফেলাই বুদ্ধিমানের লক্ষণ! তো সেই শুক্লা হাত-পা ধুয়ে চলে আসে সোজা ঘরে,‘দাদা, ভাই কি খাবে? আজ কি আপেল না আঙুর?’ রিনরিনে গলায় শব্দে চমকে উঠি রোজ। মুখটা শুকনো,পরনে আটপৌরে শালোয়ার কামিজ, কোনদিন আবার লম্বাটে ফ্রক। শুরু হয়ে যায় একই দিনের মধ্যে আরেকটা দিন। আমি মালিক,তুমি ভাই মাইনে করা কাজের লোক! তুমি মজুর ,আমি মালিক!

নিজের সঙ্গে প্রতিদিন বিস্তর ধস্তাধস্তি করেও শুধরাতে পারলাম না মেজাজ। না বলা ভালো, প্রথাগত মানসিকতার তিরিক্ষেপনাকে। কাজের লোক এলেই অহেতুক কিছু ব্যস্ততা ভর করে মাথায়। হয়তো তেমন কিছু দরকারী নয় তবু শুক্লাকে ডেকে চলেছি, কোন সাড়া নেই। মেয়েটা কি কালা? কোথায় গেলো? একরাশ বিরক্তি নিয়ে উঠে এসে এদিক ওদিক উঁকি দিয়ে দেখি, বছর বারোর মেয়ের উদাস চোখ জবা ফুলের গাছে। দেখে মাথা গরম হয়ে যায়। এতক্ষণ ধরে ডেকে চলেছি, কোন হুঁশই নেই। কী এতো ভাবে?

ব্যাপারটা কি? কালা নাকি ? ডেকে ডেকে গলা তো ব্যথা হয়ে গেলো। ভাইয়ের জামা প্যান্ট ধুয়ে ছাতে মেলেছো? চড়চড়ে রোদ রয়েছে,শুকিয়ে যেতো।সেই রিনরিনে গলায় কিছু একটা বলার চেষ্টা করেও আটকে গেলো কথা। মাথা নিচু করে বালতি নিয়ে কল পাড়ে। তাহলে যে রোজ নিজের সঙ্গে এতো লড়াই করি, তর্ক করে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করি! সব তাহলে বৃথা। যা ছিলাম তাই আছি! শুধু আজকের দিনটাতে বিশ্ব নারী দিবস।

একতলা থেকে বাড়ির উচ্চতা বেড়ে হচ্ছে দোতলা। সারাদিন ধরে ধাই-ধপাস, খট-খটাস। বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস। বাবার বিস্ফারিত চাউনি এবং মাঝেমধ্যেই অবসরকালীন সঞ্চয়ের বেশ কিছু পাস বই বের করে গভীর মনোযোগে একই সংখ্যার মাঝে ভারসাম্য খুঁজে বেড়ানো। এই গরমেও মা’র শীতকাতুরেপনা গেলো না। দুপুরের ঠা ঠা রোদেও চেয়ারে গা এলিয়ে ঘুমানোর সার্থকতা বিচার করা দুষ্কর। ডেকে দিলে কোনক্রমে টলমল করতে করতে বিছানায় শুয়ে পড়েই বলে ওঠে,‘কই রে, কম্বলটা কোথায় গেলো?’

সেই করুণাময়ী থেকে রোজ হেঁটে যে মহিলা বস্তার পর বস্তা বালি মাথায় চাপিয়ে একতলা-দোতলা করে বেড়ায়, ওকে দেখলেই কেমন যেন এক্কা-দোক্কার কথা মনে পড়ে। মাপ করে দাগ কেটে দেওয়া গণ্ডীর মধ্যেই ঝুপ করে পার হয়ে যায় চব্বিশটা ঘন্টা। ওর নাম সরমা।

কালো রঙ। রোদে পুড়ে চামড়া জ্বলে রঙটা আরো কেমন যেন পাংশুঁটে। মুখে সর্বক্ষণ তলবের কচকচানি। একদিন তো দেখলাম আবার একমনে বসে খৈনি ডলছে,আমাকে দেখেই হাত-টাত ঢেকে গলায় থুতু আটকে যাওয়ার দশা। ‘কি গো দিদি এই যে বলো এতো অভাব তাহলে সারাদিনে এই তলব গেলো কেন’?

ঘোলাটে চোখে অদ্ভুত এক হলুদের আভা। কালো মুখে চোখদুটো যেন আরো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।‘কী করবো গো ভাই,ঘরে দুটো মেয়ে। স্বামী তো রিকশা চালায়। সারাদিনে এই খাটনি, শরীর টানতে হবে তো’! এও এক বিচিত্র ব্যাখ্যা! ভালো বললে ভালো, না হলে কারই বা কী আসে যায়! অস্বস্তি কাটাতে নিজেই দারুণ মনোযোগীর ভান করে দেখতে থাকি সদ্য প্লাস্টার করা দেওয়ালের মসৃণতা কতোটা হলো!

‘দাদা,বৌদিকে বোলো না কয়েকটা ব্লাউজ দিতে। সবই এমন ছিঁড়ে গেছে যে পরা যায় না’। হাত তুলে তার দশা দেখানোর বহর দেখে বলে ফেলি,‘থাক, থাক আর বলতে হবে না। দেখবো’.... বলতে বলতে আমিও সোজা চম্পট ছাদ ছেড়ে নিজের ঘরে। রুমাকে এসে বলি,‘তোমার যে কয়েকটা ব্লাউজ ছিঁড়ে গেছিলো বলছিলে, দিয়ে দিও তো সরমাদিকে’। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা গেলো, সেটা গত মাসেই চলে গেছে রান্নার মহিলা কাজলের জিম্মায়।‘তাহলে ওর কপালে কিছু জোটার নয়’। রুমার গলায় প্রচ্ছন্ন উষ্মা,‘আমারই বা কতো আর ব্লাউজ রয়েছে। পরে দেখে দিয়ে দেবো।’ উত্তরেই বুঝে যাই ‘চ্যাপ্টার ক্লোজড’!

গরম, অলস দুপুরে টেলিভিসনের রিমোট ঘোরাতে ঘোরাতে চোখ আটকালো কোন এক চ্যানেলে। আমাদের কলেজের দিন পার হয়ে আসার সময়ের জনপ্রিয় হিন্দি ছবির দুর্দান্ত এক মেলোড্রামাটিক সিন’! তখন তো এক টাকা পঁয়ষট্টি পয়সার সিটে বসে, সারসের মতো ঘাড় তুলে হাঁ করে গেলা নায়কের দাদাগিরি,ওদিকে চোখ খুঁজে ফেরে নায়িকার দেহের ছিঁটেফোঁটা গোপন নির্যাস। টানটান উত্তেজনায় ঘেমে নেয়ে একাকার!

এখন বিজ্ঞাপনের বিরতি। দর্শকের দিকে বিচিত্র ঢঙে দাঁড়িয়ে থাকা মাধুরী দীক্ষিতের স্থির চিত্র। ঝলমলে চেহারার এক তন্বীর মুখে ধারালো হাসি,‘আপনিও চান নাকি এমনই ঈর্ষণীয় নিতম্ব? ভাববেন না, নিয়ম করে একটু সময় বের করে নিয়ে শরীর পরিচর্যায় মন দিন। দেখে নিনক্যামেরা ঘোরে। আরেক সুবেশা কন্যা শরীরে এঁটে বসা পোশাক পরে হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে দিয়ে একবার বসছেন, আবার উঠছেন। তন্বী এগিয়ে যান,কন্যার কোমর ধরে বুঝিয়ে দেন কতোটা সতর্ক এবং সচেতন হয়ে সেই ওঠ বোস করতে পারলে শুধু সুদৃশ্য নিতম্বদিয়েই বাকিদের শ্বাস তুলে দিতে পারেন অথবা বাড়িয়ে দিতে পারেন রক্তচাপ! বুঝলাম আজ নারীদের দিন। যতো পারুন শিখে নিন!

বাসে সেই পরিচিত মেয়েদের গা ছুঁয়ে যাওয়ার অন্যমনস্ক ইঁদুর দৌড়কেউ সহ্য করে, কেউ অগ্নিবর্ষণ করেন চোখেকেউ আবার আরো উদাসীন। হয়তো বা কম্রোড়োমাইজকরার চরমতম শিক্ষা রপ্ত করে ফেলেছে।

পূরবী সিনেমার গেটের পাশে প্রতিদিনের মতো আজও সেই বিশেষমুখগুলো।মস্তি মারবে আর গুনে পয়সা দেবে না। শালা!...ছেলে!অনায়াসে অপরিচিত দুই ক্রেতা-বিক্রেতার মায়েরা পেয়ে যায় একাসন! মৌলালির মোড় থেকে চলন্ত বাসে প্রতিদিন লাফিয়ে ওঠা তিন বোনের আকুতি। হাতের মধ্যে দুটো পাথরের চাকতিকে অদ্ভুত কায়দায় ধরে নিয়ে বোল তোলে দমকে দমকে। মেরি প্যারি বেহনা বনেগি দুলহনিয়াথেকে মন মানে না’!

মাথায় চুলের দুর্বোধ্য জট, নাক দিয়ে সর্দি গড়িয়ে পড়তে পড়তে এখন শুকিয়ে কাঠ! নোংরা, ধুলেমাখা হাত পাট ভাঙা ধবধবে প্যান্টের ওপর বারবার এসে পড়ে,‘দে না ভাইয়া। কুছ ভি খায়া নেহি’! মাথা গরম। সবে লন্রিধা থেকে কাচিয়ে আনা! জনসংখ্যার বাড়বাড়ন্ত থেকে বিশ্বায়ন, উদারীকরন থেকে কেন্রীগ্য় সরকারের বাপবাপান্ত আর সবশেষে নিষ্ফল আক্রোশে মনে মনেই বলে ওঠা বাঞ্চোত’!

এখন রাত। গভীর রাত। মধ্যরাতের শহর চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। শিয়ালদা স্টেশনের সামনের পানের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা রাতের অতিথির বুকে হাত দিয়ে যায় গণতন্রেরের প্রহরী। অধিকার আছে ভাই। পুরোদস্তুর সাংবিধানিক হক!

পানের দোকানে বসে থাকা বুড়োর চোখে চকচকে লালসা। হ্যা হ্যা করে হাসতে হাসতে চলে যায় মুটে, মাথায় আলুর বস্তা চাপিয়ে। সেই একঘেয়ে ছবিগুলো রোজ দেখতে দেখতে চোখে নামে আঁধার। ঘুম পায় আর ক্রমশ ক্লান্ত হতে থাকা স্নায়ুতন্রেতির বিবশতায় হারিয়ে যায় সমস্ত চেতনা আর বোধ।

চলে যায় আরেকটা মেয়েদের দিন!

Tuesday, January 26, 2010

মহা-সৌরভ-রাজ
ইন্দ্রনীল দত্ত
টুকরো টুকরো সেই ছবিগুলো এখনও অমলিন। ভেবে দেখলে তা কোনদিনই হারিয়ে যাবে না স্মৃতির ধূসর পাণ্ডুলিপির ধুলোয়। তা হারিয়ে যেতে পারে না।
নাগপুরের প্রাইড হোটেলের গোটা চত্ত্বর জুড়ে শুধু ভিড় সংবাদমাধ্যমের। একদিকে নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি রকমের ব্যস্ততা, অন্যদিকে তাঁর বিদায় বেলার সঙ্গী হতে প্রচুর মানুষের ঠাসা ভিড়। একবার, শুধু একবারের জন্য কী সাক্ষাৎ মিলবে না তাঁর? খুব কাছে যেতে না পারলেও ভিড়ের ভিতর ঠেলেঠুলে এগিয়ে গিয়ে বাড়িয়ে দেওয়া খাতা।। একটা সই, ওটাই অতি যত্নে তোলা থাকবে ব্যক্তিগত সংগ্রহে। লোককে বড় মুখ করে বলা তো যাবে,‘এই দ্যাখ, সেই মানুষটার হস্তাক্ষর যে কীনা সারাটা সময় জুড়ে শুধু অসম্ভবের সঙ্গে লড়াই করে তাকেই ফেলে দিয়েছিলো চরম লজ্জায়!’
অনেকের সঙ্গে সেই মুহূর্তের সঙ্গী হওয়ার সুযোগ হয়েছে এই প্রতিবেদকেরও। পেশাদারী মানসিকতা বারবার করে বলে যাচ্ছে যেভাবেই হোক পত্রিকার জন্য পাঠাতে হবে বিশেষ সাক্ষাৎকার, অন্যদিকে মনের ভিতর কোথায় যেন কিছু একটা হারানোর তীব্র যন্ত্রণা! সবকিছুকে সংযমের আগড়ে বেঁধে হোটেলের রিসেপশন থেকেই মোবাইলে ফোন,‘দাদা, আমার নম্বর কখন আসবে’? প্রশ্নের বহর শুনে উল্টোপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো হালকা হাসির রেশ,‘আরে, সোজা চলে এসো স্যুইমিং পুলের ধারে। গোটা ভারতবর্ষকে সামনে নিয়ে বসে আছি, তুমিও চলে এসো। বাংলা বরাবর আমার কাছে এক নম্বরে’! তড়িঘড়ি করে সেখানে পৌঁছে চোখে পড়লো সত্যিই এক বিরল দৃশ্য। আক্ষরিক অর্থে মিনি ভারতবর্ষের ছবি। সার দিয়ে বসে দেশের প্রায় সব প্রান্ত থেকে উড়ে আসা সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। তিনি এক এক করে সবার সামনে হাজির হচ্ছেন। কোন বিকার নেই, নেই বিরক্তির ছোঁয়া। পরিচিত হাসি ধরে রেখে ঠায় জবাব দিয়ে চলেছেন বহু ব্যবহারে ‘ক্লিষ্ট’ সেই প্রসঙ্গগুলোর যা তাঁকে সববসময় ধাক্কা দিয়ে গেছে ভিতরে ভিতরে!
‘দাঁড়াও, আগে ওদেরটা আগে সেরে ফেলি, বাংলার জন্য বিশেষ সময় বের করে রেখেছি। আর তো কটা মুহূর্ত, তারপর কে, কতোবার আমার কাছে আসবে, ঢের জানা আছে। ভাবতে পারো, এরাই একদিন আমার মুণ্ডুপাত করে বলছিলো ভারতীয় ক্রিকেটকে বাঁচাতে আমাকে ঘাড় ধরে বের করে দিতে হবে।আজ ওরাই আবার সব ভালো মুখ করে, সমবেদনা প্রকাশ করে ঠায় বসে একটা কথা শোনার জন্য। সত্যি, কতো অভিজ্ঞতাই না হলো!’
হ্যাঁ, ইনিই সৌরভ ‘মহারাজ’ গাঙ্গুলি। ভারতীয় ক্রিকেটের ‘মহাদাদা’। প্রাদেশিকতার সংকীর্ণ প্রাদুর্ভাবকে হেলায় দূরে সরিয়ে ভয়ঙ্কর তেজে উদ্ভাসিত এমন এক চরিত্র যাঁর বহুমুখীতা নিয়ে অনায়াসে চলতে পারে এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা। শুধুই কী ক্রিকেট? তার বাইরে পড়ে থাকা বিশাল প্রান্তরে লুকিয়ে থাকা হাজারো পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বেড়ে ওঠা এক এমন আগুন যার ছোঁয়ায় প্রথাগত সব ভাবনাগুলো জ্বলেপুড়ে একাকার হয়ে জন্ম হয়েছে এমন এক মানসিকতার যা বলতে শিখিয়েছে, লোকে কী বলছে তার থেকে অনেক বেশি মূল্যবান আমি নিজে কী ভাবছি। হ্যাঁ, কোথায় যেন সেই বহু প্রজন্ম আগে বিশ্বের বুক চিরে উঠে আসা সেই মানুষটার মতো যাকে দুনিয়া জানতো কেসিয়াস ক্লে’র নামে,‘পৃথিবী আমাকে যেভাবে চায়, আমাকে তা হতে হবে কেন? পরের শৃঙ্গটা কী হবে সেটা আমিই ঠিক করবো’! সৌরভ গাঙ্গুলি ভারতীয় তথা বিশ্বক্রিকেটের সেই ‘অভিজাত, বহুমাত্রিক বৈশিষ্টে ভরপুর এক বর্ণময় মুখ’। না, এ আমার, আপনার মনগড়া কোন উপমা নয়, এমনভাবেই বড় আদরের ‘দাদি’কে ব্যাখ্যা করেছেন ভারতীয় তথা বিশ্ব ক্রিকেটের আরেক শৃঙ্গের অধিপতি সুনীল গাভাসকার! এবং যাঁকে নিয়ে পাতার পর পাতা অনায়াসে লিখে ফেলা যায়, আবার কিছু ঘটনাকে রকাশ্যে আনা যায় না বিতর্কের চক্র এড়িয়ে যেতে।
তাহলে আজ কী মূল্যায়ণে বর্ণিত হবে এমনই এক চরিত্রের। তিল তিল করে সযত্নে লালিত সেই ক্রিকেটীয় বাসনা যা সেইসব মানুষদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিয়ে যায়, যে বঞ্চনা তাঁদের প্রতি করা হয়েছে তার অনায়াস জবাব দেওয়া সম্ভব। প্রবল এক আত্মপ্রত্যয়ের চোখ ঝলসানো বিচ্ছুরণে সেই নিন্দুকদের রাতারাতি অন্ধ বানিয়ে দিয়ে নিজেকে তুলে ধরা যায় এক সু-উচ্চ শিখরে যার দিকে মাথা তুলে তাকাতে গেলে কোথায় যেন থেমে যায় দৃষ্টি। শেষ অবধি নজর গিয়ে আর পৌঁছায় না! সেই হার না মানা মেজাজটাই সৌরভ গাঙ্গুলি নামক এক মানুষের গোপন রসায়ন। শুধু ক্রিকেটীয় শৃঙ্গজয় বলেই নয়, পাশাপাশি ভারতীয় ক্রিকেটকে আঞ্চলিকতার হাত থেকে টেনে বের করে এনে হাজির করেছিলেন এমন কিছু মুখের সারি , আজ যাদের ভিতর সবাই দেখতে পাচ্ছেন ‘নতুন ভারতের’ ছোঁয়া। মাহীন্দ্র সিং ধোনি অথবা যুবরাজ সিং, বীরেন্দ্র সেওয়াগ অথবা জাহির খান, হরভজন সিং অথবা সদ্য সাড়া জাগানো ঈশান্ত শর্মা। সৌরভেরই হাত ধরে কোন না কোন সময়ে এমনভাবে এই নামগুলির আত্মপ্রকাশ যার ‘প্রথম শো’ আদৌ হিট করবে নাকি নিখাদদ এক ‘ফ্লপ শো’র আকার নেবে, একটা সময় সেটাই ছিলো সবার আলোচ্য। কিন্তু ওটাই সৌরভ গাঙ্গুলির চ্যালেঞ্জ। দল তৈরি হবে অথচ তাকে দেখে মনে হবে কেউ দয়া করে তা হাতে তুলে দিয়েছে, সেটাই বা কী করে হজম করে নেবো অধিনায়ক হয়ে? ফলে ওই বহুদিন ধরে চলে আসা প্রাদেশিকতার লেবেল লাগানো দলের তকমা মুছে ফেলে হাজির করতে হবে একদল এমন সমস্ত দামাল ছেলেদের যাদের মাঠের ভিতর সামলাতে নাভিশ্বাস উঠে যায় প্রতিপক্ষের। স্টিভেন রজার ওয়া’র মতো লৌহকঠিন মানবও স্বীকার করে নিয়েছিলেন,‘বাপ রে! একটা দল করেছে বটে! নিজেও যেমন ডাকাবুকো, সঙ্গীগুলোকেও সেই ছাঁচে ফেলে একেবারে তপ্ত লোহাতে পরিণত করেছে। যাবে, এই ভারতীয় দলটা বহুদূর যাবে’।
কতো কীই না ঘটে! সামগ্রিকতার বিচার করতে বসলে সৌরভ গাঙ্গুলির পরিপূর্ণতা এবং প্রাপ্তি খুব সম্ভবত বাকিদের তুলনায় অনেক, অনেক বেশি। সেই ভারতীয় ক্রিকেটের অন্দরে প্রথমপ্রবেশের সময় থেকে শুরু করে বিদায়বেলাকার বিষণ্ণতা, সব জায়গাতেই সৌরভ একাই একশো!
সেই ত্রিনিদাদের চড়চড়ে রোদে একা গ্যালারিতে বসে থাকা। বাংলাদেশের কাছে প্রথম ম্যাচে হেরে ভারত কার্যত বিদায় নেওয়ার দুঃপ্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছে। গোটা ভারতীয় দল অনুশীলনে ব্যস্ত, সৌরভই শুধু বসে গ্যালারিতে। ওই চ্যাপেল রাজেরই অনুশাসনের ফল! এখনও কানে বাজে সৌরভের সেই মন্তব্যটা,‘তোমরা হয়তো সেভাবে বিশ্বাস করতে পারছো না তবে আমার মন বলছে এবার আমরা খুব তাড়াতাড়ি এখান থেকে বিদায় নেবো। হয়তো বা প্রাথমিক পর্ব থেকেই!’ আনমনে, বিড় বিড় করে বলে যাওয়া সেই কথাগুলোর ফাঁকে মহারাজের দু’চোখে অপার শূণ্যতা কোথায় যেন ধাক্কা দিয়ে গেছিলো আমাদের মতো গুটিকয় বাংলার সাংবাদিকদের চেতনায়।‘আসলে দলটা তো অখণ্ড মেজাজ নিয়েই আসতে পারেনি। প্রত্যেকে একেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের আকার নিয়ে এখানে খেলতে এসেছে। বিশ্বকাপের মতো আসরে সেই বিচ্ছিন্নতাকে কে প্রশ্রয় দেবে!’ ভারতের করুণ বিদায়ের পর চ্যাপেলও বলে ফেলেছিলেন, ওটা কোন দলই ছিলো না! বেহালার বীররেন রায় রোডের বাড়িতে বসে সৌরভ বলে উঠেছিলেন,‘কী মিলে গেলো তো!’
আবার এবারই অস্ট্রেলিয়াতে একদিনের দল থেকে বাদ পড়ার পর গোটা ভারত জুড়ে সোরগোল। এ কী করলো ধোনি? জানাই ছিলো, ধোনি এবং পারিষদরা তার বহু আগে থেকেই ‘দাদা’কে একদিনের দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য মরিয়া প্রয়াস শুরু করে দিয়েছে। ব্রিসবেনে বসে সৌরভ নিজেই অনুরোধ জানয়েছিলেন, শুধুমাত্র ওই একদিনের সিরিজটাতে খেলতে এবং তারপরেই নিজেই ঘোষণা করে দিতেন একদিনের ক্রিকেট থেকে সরে যাওয়ার কথা। আই পি এল’য়ে চেন্নাইতে ম্যাচ ধোনির বিরুদ্ধে। জিজ্ঞাসা করেছিলাম,‘এবারই তাহলে ওকে জবাব দেওয়ার কাজটা সেরে ফেললে হয় না!’ সৌরভ কেমন যেন অবাক হয়ে গেলেন,‘তোমরা বারবার করে মাহীকে কেন খলনায়ক বানিয়ে ফেলছো?আমি কী জানিনা, ওর কিছু করার নেই, ভারতীয় ক্রিকেটের মাথায় যাঁরা বসে রয়েছে তাঁরাই তো সবকিছু ঠিক করে রেখেছে আমাকে বিদায় জানানোর জন্য। মাহী তো তার উপলক্ষ্য মাত্র। ছেলেটা ধোনা না হয়ে রাম, শ্যামও হতে পারতো! মাহী কিন্তু লম্বা রেসের ঘোড়া, বহুদূর নিয়ে যেতে পারবে ভারতীয় ক্রিকেটকে’।
নানা সময়ে ভিন্ন আঙ্গিকে নিজেকে মেলে ধরা এমনই সৌরভ গাঙ্গুলির গভীরতা মাপতে যাওয়া বিশাল এক বোকামি। এতো পাকা এবং গভীর এবং স্বচ্ছ ক্রিকেটবোধ খুব কমই পেয়েছে পঁচাত্তর বছরে পা রাখা ভারতীয় ক্রিকেট। মনে আছে, মোহালিতে সৌরভের খেলা দেখতে আচমকা হাজির ভারতীয় ক্রিকেটের আরেক ডাকসাইটে ব্যক্তিত্ব মনসুর আলি খান পতৌদি বলে উঠেছিলেন,‘ছেলেটার ভাবনার তারিফ করতে হয়।মুহূর্তের ভিতর কীভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হবে, তা অনায়াসে শুধু ভাবেই না কাজেও তা লাগিয়ে দেয়। একেকটা সময় মনে হয়, আমার সময়েও যদি ওর মতো এমন একটা ছেলেকে পেতাম..!’ পাশে বসা ‘বিবি’ শর্মিলা ঠাকুরের সহাস্য মন্তব্য ছিলো,‘আরে বাবা, ঘরানাটা দেখতে হবে তো। হাজার হোক বাঙালির রক্ত লুকিয়ে রয়েছে। তার তেজই আলাদা!’
গড়পড়তা বাঙালীর মনে যে বিশ্ব জয় করার স্বপ্ন অহরহ জন্ম নেয় এবং তা মিলিয়ে যেতেও খুব সময় নেয় না, সৌরভ গাঙ্গুলি সেই ‘দুঃসাহসী, কল্পনাবিলাসী’ জাতির সেরা আইকন, যিনি কীনা বুঝিয়ে দিয়েছেন ওই মান্ধাতা আমালের ভাবনার কোন জায়গাই নেই আজকের এই রাস্তায়। ভারতীয় ক্রিকেটে ‘আমচি মুম্বাই’ তো এখনও শীর্ষে। খেলতে পারো ছাই না পারো, মুম্বাই থেকে উঠে আসার অর্থ প্রচণ্ড লড়াই করার মানসিক শক্তি নিয়েই সেই মুখের আবির্ভাব ঘটেছে। সে তুলনায় বাঙালীর ছেলে মানেথ তো মাথার ওপরে বল উঠলেই বাড়ির লোকের কথা মনে পড়ে যায়! সৌরভ এমনাভবে সেই প্রথাটা ভাঙলেন যার ভাষায় ব্যাখ্যা চলে না! এক অনুপ্রেরণা উদ্রেককারী চরিত্র যে কীনা প্রতিমুহূর্তে যে কোন ধরণের প্রতিকূলতার সঙ্গে সমানে সমানে লড়াই করতে তৈরি। এবং পাশে থাকা বাকিদের ভিতরও সেই মন্ত্র মগজে ভরে দিতে খুব একটা পরিশ্রমও করার প্রয়োজন অনুভব করেননি। প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে সেই অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করাটা এমন এক স্বভাবের আকার নিয়েছিলো যা বাকি সবাইকে ‘অন্যকিছু’ ভাবার জন্য বাধ্যই করে দিয়েছিলো। এবং প্রতিবারই বাজি জিতেছেন তিনিই!
ইতিহাস কতো কথাই না বলে! শোনা যায়, বাংলার বড়লাট লর্ড কার্জন নাকি বলেছিলেন,‘বাঙালির সাহস খরগোশের মতো আর বুদ্ধি গ্রিকদের মতো’! খুব স্বাভাবিকভাবেই বাংলা ভাগ করে ফেলার কারিগর প্রশংসা করে তেমন মন্তব্য করেননি। ‘দাদাগিরি’ ওখানেই প্রথম হেনেছিলো আঘাত। তবে সেটার শুরু তো সেই ১৯৯২ সালে, যখন কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি বেহালার বীরেন রায় রোডের এক বে-পরোয়া যুবকই একদিন ভেঙেচুরে একশা করে দেবেন ভারতীয় ক্রিকেটের মরচে পড়ে যাওয়া কাঠামো! মহাতারকাদের ভিড়ে বসে থাকা সেই প্রথম সফরেই আজহারদের ম্যানেজার রনবীর সিং মাহীন্দ্র বলেছিলেন মাঠে গিয়ে জল দিয়ে আসতে। ফোঁস করে উঠেছিলো প্রতিবাদসুলভ মনটা,‘জল বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতীয় দলে আসিনি। আমি কলকাতার মহারাজ’! ঘটনাটা এখন সঙ্গত কারণেই এড়িয়ে যান সৌরভ কিন্তু সেটাই ছিলো এক অতি-মানবিক চরিত্রের আগমনী বার্তা! ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো সেই সীমাহীন উদ্যম, উদ্ধত ক্রিকেটদর্শন, প্রতিভাদের খুঁজে বের করে তাদের সযত্নে লালন করার মমতা ভরা দৃষ্টি এবং নিজের তথা সঙ্গীদের প্রতি নিরবিচ্ছিন্ন বিশ্বাসবোধ। রাতারাতি পালটে গেলো ভারতীয় ক্রিকেটের ম্যালেরিয়া সুলভ কম্পন এবং নুইয়ে পড়া অবসাদের ঘোর। সৌরভের নিজের কথা ধার করে বলতে গেলে,‘শচীনকে বাদ দিলে ভারতীয় ক্রিকেটে বাকি সবাইকেই ছাপিয়ে যেতে পারি, সেই বিশ্বাস আমার ছিলো শুরু থেকেই। পরে ক্রমে বুঝলাম বাংলা থেকে খেলতে যারা আসে তাদের প্রতি শিবিরের ভিতরেই কোথায় যেন একটা শূণ্যস্থান থাকেই এবং সেখান থেকেই ওই আঞ্চলিকতার তত্ত্ব আরো জোরালো হয়ে পড়ে। ঠিক করে নিলাম, এমন একটা দল বানবো যাদের পোশাকের তলায় লোকানো থাকবে এ কে ৪৭, মুখে থাকবে অবিশ্রাম বুলি আর চোখে চোখ রেখে ভয় পাইয়ে দেওয়ার সাহস। এই দাদাগিরি না চালালে খুব মুশকিল!’
দাদাগিরি! না, সেটা বড় ‘খেলো’ হয়ে যায়। বলা ভালো, এমন এক উদ্ধত শাসক হাজির হয়েছিলেন যার পায়ের শব্দে ঘুম ছুটেছে বহু রথী, মহারথীর। এক অদ্ভুত দ্বৈতসত্তা নিয়ে সৌরভ গাঙ্গুলি রাজ করে গেলেন ক্রিকেটকে। কখনও খুব চেনা, অতি আদরের, প্রচুর ভুলে ভরা একটা আড্ডাবাজ ছেলের মেজাজ। আবার সেই রূপটাই একলহমায় বদলে যাচ্ছে বাইশ গজের ওই জমিতে পা রাখার পরেই। সেখানে পড়ে জবাব দেওয়ার হাজারো সব প্রেক্ষিত এবং হরেক সব বহুরূপীদের সার দিয়ে অপেক্ষায় থাকার মুহূর্ত। তাঁর আগে অনেকেই এসেছেন, লিখে গেছেন অনেক কাহিনী কিন্তু গল্প হিসাবে তার জনপ্রিয়তা অথবা প্রাসঙ্গিকতা ঠিক কতোখানি ছিলো সেই বিচার করার লোকেরই ছিলো অভাব। সৌরভ কিন্তু খুব কর্কশভাবেই তিনিই, ভালো সময়ে এবং খারাপ সময়েও। ওই যে কথায় বলে না, ‘মুরোদ’ থাকা চাই, ওটাই সতীর্দের পাশাপাশি ভারতীয় ক্রিকেটকেও নতুন করে শিখিয়ে দিলেন দাদা। ম্যাচ গড়াপেটার গাড্ডায় পড়ে নাভিশ্বাস তুলতে থাকা ভারতীয় ক্রিকেট যে আবারও ফিরে আসতে পারবে এবং এমন সাড়ম্বরে তা জেন কেউ ভাবনার ভিতরেই আনতে পারেননি। এক অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতা, সাঙ্ঘাতিক এক লোভের হাতছানি, রাশিকৃত বিতর্কের অনবরত তাড়া করে ফেরা। সেই প্রচণ্ড দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে সবাইকে টেনে বাইরে বের করে এনে সৌরভই দেখিয়ে দিলেন নতুন নিশানা। একটা রণহুঙ্কার, এবং তা ক্রমে এক বিশাল উচ্চতায় গিয়ে গিলে ফেললো বাকি সবকিছুকে।
একটা ভাবনা, একটা প্রতিবাদ, আর বিস্তর সব লড়াই। নিজেকে চেনানোর পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে থাকা সতীর্থদেরও তুলে ধরা ভিন্ন এক আঙ্গিকে। সৌরভ গাঙ্গুলির বিদায়ের পর আবার তা দেখা যাবে তো! গোটা একটা দল একই মনস্তত্ত্বে বিশ্বাস করে উড়িয়ে দিচ্ছে যে কোনধরণের প্রতিরোধ, পায়ের কাছে এসে নতজানু হয়ে পরাজয় স্বীকার করে নিচ্ছে তাবড় দলের তাবড় নায়করা। সেই ছবিটা আবার ফিকে হয়ে যাবে না তো! হোক বা না হোক, সেই সুগন্ধটা বোধহয় আর ফিরে পাওয়ার নয়। করাচিতে পাকিস্তানকে টেস্ট সিরিজে ঘায়েল করে হোটেলের লবিতে ঢুকে সৌরভ গাঙ্গুলি হুঙ্কার ছেড়েছিলেন,‘মুগাম্বো আব খুশ হুয়া!’ হাজির হোটেলের আধিকারিকরা পর্যন্ত এসে সেই হুঙ্কারে গলা মিলিয়েছিলেন! অথবা বেঙ্গালুরুতে প্রবল নিরাপত্তার ধাক্কায় ভিড়ের ভিতর পড়ে যাওয়া এক বছর আষ্টেকের ছোট্ট মেয়েকে কোলে বসিয়ে অটোগ্রাফ খাতায় পরপর সই দিয়ে যাওয়ার পরিতৃপ্তি ( পরে যা নিয়ে বলেছিলেন, ওকে দেখে আমার মেয়ে সানার কথা মনে পড়ে গেলো। সানা ওইভাবে পড়ে গেলে আমি কী হাতে হাত দিয়ে বসে থাকতাম!)। না, খুব সম্ভবত সেই অমলিন মুহূর্তগুলোকে এখন শুধু নীরবে স্মরণ করে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন উপায়ই নেই!
নাগপুরে শেষ টেস্টের সময়েই একদিন আড্ডার ছলে প্রশ্ন করেছিলাম,‘ওই ১৯৯২ সালের পর আর ভারতীয় দলে জায়গা না পেলে কী করতেন’? সপাটে জবাব,‘কেন! ব্যবসায়ী হতাম’। কিসের ব্যবসা? সামান্য চিন্তা করে হাসতে হাসতে জবাব দিলেন,‘কাপড়ের ব্যবসায়ী হতাম। ইস! তাহলে তোমাদের সঙ্গে দেখাও হতো না, তোমরাও কেউ আসতে না আমার কাছে’! যদি তাই হতো, ভারতীয় ক্রিকেট কী হারাতো তার গতি? বড় কঠিন হয়ে গেলো বোধহয় প্রশ্নটা। তার থেকে ওই কেসিয়াস ক্লে’র কথাটাই আরো একবার উচ্চারণ করা ভালো,‘পুনরাবৃত্তি যদি দৃঢ়তার সঙ্গে করা যায়, তার থেকে জন্ম নেয় এক বিশ্বাস। এবং সেই বিশ্বাসে যখন জন্ম নেয় প্রত্যয়, তখনই ঘটনার শুরু’।
দাদা একচুলও নিজের বিশ্বাস থেকে নড়েননি। দাদা কিন্তু বাজি জিতেই বেরিয়ে গেলেন!